রামাদান,রোজা,তারাবীহ,সাহরি,ইফতার ও শবে ক্বদর

17

 

বিসমিল্লাহির রাহমানীর রাহীম

ভূমিকাঃ-আজ ২৩ শাবান/১৪৪২ হিজরী ।ইনশাল্লাহ এক সপ্তাহ পর শুরু হবে রহমত,বরকত,মাগফিরাত ও নাজাতের মাস মাহে রামাদান।রোজা,তারাবীহ, ফতার ও সাহরীর মাস।ইবাদত,তাহমিদ,তাসবিহ ও তেলাওয়াতের মাস। দোয়া, ইসতিগফার,সাদকাহ,ও সহমর্মিতার মাস। কুরআন, ফিৎরা,তাকওয়া ও ধৈর্যর মাস। আত্মশুদ্ধি, শবে ক্বদর,সংযম,আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও রিজিক বৃদ্ধির মাস। মাহে রামাদান সমাগত। অন্যান্য বছরের তুলনায় আলাদা আমেজ । দ্বিতীয় বছররের মত মাহামারী করোনা ভাইরাস থেকে নিষ্কৃতি প্রার্থনার জন্য এক সূবর্ণ সুযোগ। তাই রামাদান,রোজা, তারাবীহ,সাহরি,ইফতার,শবে ক্বদর ও নেক আমল সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)এর হাদীসের ভিত্তিতে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত।

মাহে রামাদানের মহিমাঃ-
০১.পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেনঃ-
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدىً لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْه
অর্থাৎ“রমজান মাস এমন মাস যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে; মানবজাতির জন্য হিদায়েতের উৎস, হিদায়াত ও সত্য মিথ্যার মাঝে পার্থক্যকারী সুস্পষ্ট নিদর্শন হিসেবে। সুতরাং তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তি এই মাস পাবে সে যেন রোজা পালন করে।” [সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৮৫]
হাদীস শরীফে আছেঃ-
أَبْو هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ يَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ إِذَا دَخَلَ رَمَضَانُ فُتِّحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةَِغُلِّقَتْ أَبْوَابُ جَهَنَّمَ، وَسُلْسِلَتِ الشَّيَاطِينُ ‏”‏‏.‏

অর্থঃ-আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ: আল্লাহর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন রমযান মাস আরম্ভ হয়, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় আর শয়তানদেরকে শিকলে বেঁধে রাখা হয়। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৩২৭৭)
হাদীস শরীফে আছেঃ-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَقُولُ ‏ “‏ الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ وَالْجُمُعَةُ إِلَى الْجُمُعَةِ وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ مُكَفِّرَاتٌ مَا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنَبَ الْكَبَائِرَ ‏”‏

অর্থঃ-আবূ হুরাইরাহ্(রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ পাঁচ ওয়াক্ত সলাত, এক জুমু’আহ্‌ থেকে আরেক জুমু’আহ্‌ এবং এক রমাদান থেকে আরেক রমাদান, তার মধ্যবর্তী সময়ের জন্য কাফফারাহ্‌ হয়ে যাবে যদি কবীরাহ্‌ গুনাহ হতে বেঁচে থাকে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৪৪০)
হাদীস শরীফে আছেঃ-

وَعَنْ سَلْمَانَ الْفَارِسِىِّ ، قَالَ : خَطَبَنَا رَسُوْلُ اللّٰهِ صلى الله عليه وسلم فِى اٰخِرِ يَوْمٍ مِنْ شَعْبَانَ فَقَالَ : يَا أَيُّهَا النَّاسُ! قَدْ أَظَلَّكُمْ شَهْرٌ عَظِيمٌ، شَهْرٌ مُبَارَكٌ، شَهْرٌ فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، جَعَلَ اللهُ تَعَالٰى صِيَامَه فَرِيضَةً، وَقِيَامَ لَيْلِه تَطَوُّعًا، مَنْ تَقَرَّبَ فِيهِ بِخَصْلَةٍ مِنَ الْخَيْرِ كَانَ كَمَنْ أَدّٰى فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ، وَمَنْ أَدّٰى فَرِيضَةً فِيهِ كَانَ كَمَنْ أَدّٰى سَبْعِينَ فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ. وَهُوَ شَهْرُ الصَّبْرِ، وَالصَّبْر ثَوَابُهُ الْجَنَّةُ، وَشَهْرُ الْمُوَاسَاةِ، وَشَهْرٌ يُزْدَادُ فِيهِ رِزْقُ الْمُؤْمِنِ، مَنْ فَطَّرَ فِيهِ صَائِمًا كَانَ لَه مَغْفِرَةً لِذُنُوْبِه، وَعِتْقَ رَقَبَتِه مِنَ النَّارِ، وَكَانَ لَه مِثْلُ أَجْرِه مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أَجْرِه شَىْءٌ» قُلْنَا : يَا رَسُوْلَ اللّٰهِ! لَيْسَ كُلُّنَا نَ جِدُ مَا نُفَطِّرُ بِهِ الصَّائِمَ. فَقَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ صلى الله عليه وسلم : «يُعْطِى اللّٰهُ هٰذَا الثَّوَابَ مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا عَلٰى مَذْقَةِ لَبَنٍ، أَوْ تَمْرَةٍ أَوْ شَرْبَةٍ مِنْ مَاءٍ، وَمَنْ أَشْبَعَ صَائِمًا؛ سَقَاهُ اللّٰهُ مِنْ حَوْضِىْ شَرْبَةً لَا يَظْمَأُ حَتّٰى يَدْخُلَ الْجَنَّةَ. وَهُوَ شَهْرٌ أَوَّلُه رَحْمَةٌ، وَأَوْسَطُه مَغْفِرَةٌ، وَاٰخِرُه عِتْقٌ مِنَ النَّارِ. وَمَنْ خَفَّفَ عَنْ مَمْلُوكِه فِيهِ؛ غَفَرَ الله لَه وَأعْتَقَه مِنَ النَّارِ

অর্র্থঃ-সালমান আল ফারিসী থেকে বর্ণিতঃ: তিনি বলেন, শা‘বান মাসের শেষ দিনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, হে লোক সকল! একটি মহিমান্বিত মাস তোমাদেরকে ছায়া হয়ে ঘিরে ধরেছে। এ মাস একটি বারাকাতময় মাস। এটি এমন এক মাস, যার মধ্যে একটি রাত রয়েছে, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আল্লাহ এ মাসের সিয়াম ফরয করেছেন আর নফল করে দিয়েছেন এ মাসে রাতের কিয়ামকে। যে ব্যক্তি এ মাসে একটি নফল কাজ করবে, সে যেন অন্য মাসের একটি ফরয আদায় করল। আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরয আদায় করেন, সে যেন অন্য মাসের সত্তরটি ফরয সম্পাদন করল। এ মাস সবরের (ধৈর্যের) মাস; সবরের সাওয়াব জান্নাত। এ মাস সহমর্মিতার। এ এমন এক মাস যাতে মু’মিনের রিযক বৃদ্ধি করা হয়। যে ব্যক্তি এ মাসে কোন রোজাদাকে ইফতার করাবে, এ ইফতার তার গুনাহ মাফের কারণ হবে, হবে জাহান্নামের অগ্নিমুক্তির উপায়। তার সাওয়াব হবে রোজাদারের অনুরূপ। অথচ রোজাদারের সাওয়াব একটুও কমানো হবে না। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের সকলে তো রোজাদারের ইফতারীর আয়োজন করতে সমর্থ নয়। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ সাওয়াব আল্লাহ তা‘আলা ঐ ইফতার পরিবেশনকারীকেও প্রদান করেন, যে একজন সায়িমকে এক চুমুক দুধ, একটি খেজুর অথবা এক চুমুক পানি দিয়ে ইফতার করায়। আর যে ব্যক্তি একজন রোজাদারকে পেট ভরে খাইয়ে পরিতৃপ্ত করল, আল্লাহ তা‘আলা তাকে আমার হাওযে কাওসার থেকে এভাবে পানি পানে পরিতৃপ্ত করবেন, যার পর সে জান্নাতে (প্রবেশ করার পূর্বে) আর পিপাসার্ত হবে না। এমনকি সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এটা এমন এক মাস যার প্রথম অংশে রহমত। মধ্য অংশে মাগফিরাত, শেষাংশে জাহান্নামের আগুন থেকে নাজাত। যে ব্যক্তি এ মাসে তার অধিনস্তদের ভার-বোঝা সহজ করে দেবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন। তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেবেন। (মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস নং ১৯৬৫ হাদিসের মান: মুনকার)

রামাদানের রোজার হুকুম ও ফজিলতঃ-
রামাদানের রোজা রাখা সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের উপর ফরজে আইন। সাথে সাথে অনেক ফজিলতপূর্ণ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার। [সূরা আল-বাক্বারাহ:১৮৩]

পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন-
أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍ ۚ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ ۚ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ ۖ فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ ۚ وَأَن تَصُومُوا خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ
অর্থাৎ গণনার কয়েকটি দিনের জন্য অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে, অসুখ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে। আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্ট দায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্যদান করবে। যে ব্যক্তি খুশীর সাথে সৎকর্ম করে, তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি রোজা রাখ, তবে তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার। [সূরা আল-বাক্বারাহ:১৮৪]
হাদীস শরীফে আছেঃ-

عَنِ ابْنِ عُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالْحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ ‏

অর্থঃ-ইবন ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ: তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি। ১. আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা। ২. সলাত কায়িম করা। ৩. যাকাত আদায় করা। ৪. হাজ্জ সম্পাদন করা এবং ৫. রমযানের সিয়ামব্রত (রোজা) পালন করা (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৮ )
হাদীস শরীফে আছেঃ-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، – رضى الله عنه – قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ يُضَاعَفُ الْحَسَنَةُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِمِائَةِ ضِعْفٍ قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلاَّ الصَّوْمَ فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ يَدَعُ شَهْوَتَهُ وَطَعَامَهُ مِنْ أَجْلِي لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِهِ وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّهِ ‏.‏ وَلَخُلُوفُ فِيهِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ رِيحِ الْمِسْكِ ‏”‏ ‏

অর্থঃ-আবূ হুরায়রাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ: তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “মানব সন্তানের প্রতিটি নেক কাজের সাওয়াব দশ গুন থেকে সাতশ’ গুন পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়া হয়। মহান আল্লাহ্‌ বলেন, “কিন্তু রোজা আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিফল দান করব। বান্দা আমারই জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে।” রোজা পালনকারীর জন্য দু’টি আনন্দ আছে। একটি তার ইফতারের সময় এবং অপরটি তার প্রতিপালক আল্লাহ্‌র সাথে সাক্ষাতের সময়। সিয়াম পালনকারীর মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহ্‌ তা’আলার কাছে মিশকের সুগন্ধির চেয়েও অধিক সুগন্ধময়। ( সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৫৯৭)
হাদীস শরীফে আছেঃ-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
অর্থঃ-আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ: তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ঈমানসহ পূণ্যের আশায় রমযানের রোজা পালন করে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৩৮)

তারাবীহ কিয়ামুল্লাইল ও তাহাজ্জুদ নামাযঃ-
রোজার সাথে তারাবীর নামাজ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিয়ামুল্লাইল ও তাহাজ্জুদের সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়। হাদীস শরীফে আছে-

حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ، قَالَ حَدَّثَنِي مَالِكٌ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ حُمَيْدِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‏”‏‏

অর্থঃ-আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ: তিনি বলেন যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ যে ব্যক্তি রামাদানের রাতে ঈমানসহ পূণ্যের আশায় রাত জেগে ইবাদত করে, তার পূর্বের গুনাহ্‌ ক্ষমা করে দেয়া হয়। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৩৭ )
হাদীস শরীফে আছে-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، – رضى الله عنه – قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ وَأَفْضَلُ الصَّلاَةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلاَةُ اللَّيْلِ ‏”‏ ‏

অর্থঃ-আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ: তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: রমাযানের সিয়ামের পর সর্বোত্তম সওম হচ্ছে আল্লাহ্‌র মাস মুহাররমের সওম এবং ফরয সলাতের পর সর্বোত্তম সলাত হচ্ছে রাতের সলাত। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৬৪৫)

হাদীস শরীফে আছে-

قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ أَيُّهَا النَّاسُ أَفْشُوا السَّلاَمَ وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ وَصَلُّوا وَالنَّاسُ نِيَامٌ تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ بِسَلاَمٍ

অর্থঃ-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ- হে মানুষগণ! তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, খাদ্য দান কর এবং মানুষ ঘুমিয়ে থাকাবস্থায় (তাহাজ্জুদ) নামায আদায় কর। তাহলে নিশ্চয়ই তোমরা সহীহ-সালামতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিজি, হাদিস নং ২৪৮৫)

তারাবীহ নামায বিশ রাকাতঃ-
মক্কায় অবস্থিত বাইতুল্লাহ এবং মদীনায় অবস্থিত মসজিদে নববীতে আবাহমান কাল থেকে যা চলে আসছে। নিম্নে কিছু দলিল উপস্থাপন করা হলোঃ-
عن ابن عباس ان رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يصلى فى رمضان عشرين ركعة والوتر
অর্থাৎ হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ রমজান মাসে বিশ রাকাত এবং বিতির পড়তেন। {মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা-২/২৯৪, হাদীস নং- ৭৬৯২, মুসনাদে আব্দ বিন হুমাইদ-২১৮, আল মুজামুল কাবীর, হাদীস নং-১২১০২, মাজমাউজ যাওয়ায়েদ, হাদীস নং-১৭২, সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-৪৩৯১}
عن جابر بن عبد الله قال خرج النبى صلى الله عليه وسلم ذات ليلة فى رمضان فصلى الناس اربعة وعشرون ركعة واوتر بثلاثة
অর্থাৎ হযরত জাবের রাঃ বলেনঃ রমজান মাসের এক রাতে রাসূল সাঃ বাহিরে তাশরীফ নিয়ে এলেন। আর সাহাবায়ে কেরামকে ২৪ রাকাত [৪ রাকাত ঈশার, আর ২০ রাকাত তারাবীহের] নামায পড়ালেন। আর তিন রাকাত বিতির পড়ালেন। [তারীখে জুরজান-২৭}
عن يحيى بن سعيد ان عمر بن الخطاب امر رجلا يصلى بهم عشرين ركعة
অর্থাৎ হযরত ইয়াহইয়া বিন সাঈদ থেকে বর্ণিত। নিশ্চয় ওমর বিন খাত্তাব রাঃ এক ব্যক্তিকে বিশ রাকাত পড়ার হুকুম দিলেন। {মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা-২/২৯৩}
হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) খেলাফতের পদে অধিষ্ঠিত থেকে রাষ্ট্রিয় ফরমান হিসেবে তাঁর অধীনদেরকে ঐ নির্দেশ দিয়েছেন।আর খলিফাদের নির্দেশ মান্য করা অবশ্য কর্তব্য। যেমন আল্লাহ বলেন-
يا ايها الذين امنوا اطيعوا الله واطيعوا الرسول واولى الامر منكم-
অর্থাৎ হে ইমানদারগণ তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তাঁদের যাঁরা তোমাদের মধ্যে ক্ষমতার অধিকারী আমির।(আল-কোরআন, সূরা নিসা, আয়াত নং- ৫৯)
وروى مالك من طريق يزيد بن خصيفة عن السائب بن يزيد عشرين ركعة
অর্থাৎ হযরত সায়েব বলেনঃ অর্থাৎহযরত ওমর রাঃ এর সময়কালে বিশ রাকাত তারাবীহ ছিল। {ফাতহুল বারী-৪/৪৩৬} যার সনদ বুখারীতে দুই স্থানে আছে।

عن السائب بن يزيد ، قال : كنا نقوم في زمان عُمَر بن الخطاب رضي الله عنه بعشرين ركعة والوتر
অর্থাৎ হযরত সায়েব বিন ইয়াজিদ রাঃ বলেনঃ আমরা হযরত ওমর রাঃ এর শাসনামলে বিশ রাকাত তারাবীহ ও বিতির পড়তাম। {সুনানে সুগরা লিল বায়হাকী, হাদীস নং-৮৩৩, মারিফাতুস সুনান ওয়াল আসার, হাদীস নং-১৪৪৩}
ইমাম নববী রহঃ, সুবকী রহঃ [শরহুল মিনহাজ], মোল্লা আলী কারী রহঃ [শরহুল মুয়াত্তা] ও সুয়ুতী রহঃ এ বর্ণনাকে সহীহ বলেছেন।
محمد بن كعب القرظى كان الناس يصلون فى زمان عمر بن الخطاب فى رمضان عشرين ركعة ويوترون بثلاث
অর্থাৎ মুহাম্মদ বিন কাব কুরজী বলেনঃ ওমর ফারুক রাঃ এর শাসনামলে লোকেরা রমজান মাসে বিশ রাকাত তারাবীহ ও তিন রাকাত বিতির পড়তো।
عن يزيد بن رومان ، أنه قال : « كان الناس يقومون في زمان عمر بن الخطاب في رمضان بثلاث وعشرين ركعة »
অর্থাৎ হযরত ইয়াজিদ বিন রূমান বলেনঃ লোকেরা হযরত ওমর রাঃ এর শাসনামলে বিশ রাকাত তারাবীহ এবং তিন রাকাত বিতির রমজান মাসে আদায় করতো। {মারিফাতুস সুনান ওয়াল আসার, হাদীস নং-১৪৪৩, মুয়াত্তা মালিক, হাদীস নং-৩৮০, সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-৪৩৯৪}

রোজার জন্য সাহরি খাওয়ার ফজিলত:-

সাহরি হলো রোজার অন্যতম একটি অংশ। রোজা রাখার নিয়তে রাতের শেষদিকে কোন হালাল খাবার খাওয়াকে সাহরি বলে । সাহরি খাওয়া রাসূল (সা.) এর পছন্দনীয় কাজ তথা সুন্নাত । রোজা রাখার জন্য স্বয়ং মহানবী (সা.) নিজেই সাহরি খেতেন এবং সাহাবিদের সাহরি খাওয়ার জন্য বলতেন। কখনো সাহাবিদের একসঙ্গে নিয়ে সেহেরি খেতেন এবং জামাতে ফজরের নামাজ আদায় করতেন। সাহরি খাওয়া ফরজ নয়। তাই সাহরি খেতে না পারলেও রোজা হয়ে যাবে ।
মহান আল্লাহ নিজেই শেষরাতে পানাহার করার কথা বলেছেন। আল্লাহ বলেন-
وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ
অর্থঃ-পানাহার কর যতক্ষণ না কালো রেখা থেকে ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার দেখা যায়। অতঃপর রোযা পূর্ণ কর রাত পর্যন্ত।(সূরা বাকারা-১৮৭)

সাহরির ফজিলত সম্পর্কে নবী (সাঃ) এর কয়েকটি হাদীস নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ-

سَمِعْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم تَسَحَّرُوا فَإِنَّ فِي السَّحُورِ بَرَكَةً

অর্থঃ-আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা সাহরী খাও। কেননা সাহরীতে বরকত রয়েছে। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১৯২৩)

إِسْحَقُ بْنُ مَنْصُورٍ، قَالَ: أَنْبَأَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ، قَالَ اللَّهِ بْنَ الْحَارِثِ، يُحَدِّثُ عَنْ رَجُلٍ، مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: دَخَلْتُ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ يَتَسَحَّرُ، فَقَالَ: «إِنَّهَا بَرَكَةٌ أَعْطَاكُمُ اللَّهُ إِيَّاهَا فَلَا تَدَعُوهُ»

অর্থঃ-ইসহাক ইব্‌ন মানসূর (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন যে, আমি একদা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গেলাম যখন তিনি সাহারী খাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন যে, এতে বরকত রয়েছে, আল্লাহ তা’আলা এ বরকত তোমাদেরকেই দান করেছেন। অতএব তোমরা একে ছাড়বে না। (সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস নং ২১৬২)

عَنْ الْمِقْدَامِ بْنِ مَعْدِ يكَرِبَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: عَلَيْكُمْ بِغَدَاءِ السُّحُورِ فَإِنَّهُ هُوَ الْغَدَاءُ الْمُبَارَكُ

অর্থঃ- মিকদাম ইব্‌ন মা’দী কারিব (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ তোমরা ভোর রাত্রের খাদ্য অবশ্যই খাবে। কেননা সেটাই সকাল বেলার পবিত্র খাবার। (সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস নং ২১৬৪)

عَنِ ابنِ عُمَرَ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم إِنَّ اللهَ وَمَلائِكَتُهُ يُصَلُّونَ عَلَى الْمُتَسَحِّرِينَ

অর্থঃ-ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “অবশ্যই আল্লাহ তাদের প্রতি করুণা বর্ষণ করেন, যারা সেহরী খায়, আর ফিরিশতাবর্গও তাদের জন্য দুআ করে থাকেন।” (ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৬৪৩৪, ইবনে হিব্বান ৩৬৬৭)

عَنْ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَال‏ فَصْلُ مَا بَيْنَ صِيَامِنَا وَصِيَامِ أَهْلِ الْكِتَابِ أَكْلَةُ السَّحَرِ

অর্থঃ-আম্‌র ইবনু ‘আস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ আমাদের ও কিতাবীদের সিয়ামের মধ্যে পার্থক্য হ’ল সাহরি খাওয়া।(সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-২৪৪০ )

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ نِعْمَ سَحُورُ الْمُؤْمِنِ التَّمْرُ

অর্থঃ- আবূ হুরাইরা্হ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ঈমানদার ব্যক্তির জন্য খেজুর দিয়ে সাহারী খাওয়া কতোই না উত্তম। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২৩৪৫)

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم السحور أكله بركة فلا تدعوه، ولو أن يجرع أحدكم جرعة من ماء
অর্থঃ-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ সাহরি হলো বরকতের খাবার,সাহরি ছেড়ে দিওনা,যদি এক ঢোক পানিও হয়। (মুসনাদে আহমাদ)

قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم لا تزال أمتي بخير ما أَخَّروا السحور وعجَّلوا الفطر

অর্থঃ-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃআমার উম্মত ততক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণের উপর থাকবে যতক্ষণ তারা (সময় হলে) দ্রুত ইফতার করবে এবং শেষ সময়ে সাহরি খাবে। (মুসনাদে আহমাদ)

عَنْ زَيْدِ بْنِ ثَابِتٍ، – رضى الله عنه – قَالَ تَسَحَّرْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ثُمَّ قُمْنَا إِلَى الصَّلاَةِ قُلْتُ كَمْ كَانَ قَدْرُ مَا بَيْنَهُمَا قَالَ خَمْسِينَ آيَةً ‏.

অর্থঃ- যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সাহ্‌রী খেয়ে সালাতে দাঁড়ালাম। [রাবী আনাস (রাঃ) বলেন] আমি যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, সাহ্‌রী ও আযানের মধ্যে কত সময়ের ব্যবধান ছিল? তিনি বলরেন, পঞ্চাশ আয়াত(কুরআন)পড়ার মতো সময়ের।( সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৪৪২ )

সাহরির সময় দোয়া কবুল: মাহে রমজানে সাহরির সময় দোয়া কবুল হয়। তাবরানি সংকলিত হাদিস গ্রন্থের একটি হাদিসে উদ্ধৃত হয়েছে, রাসুলে করিম (সা.) বলেছেন, রাতের সাহরির সময় দোয়া কবুল হয়।
রাসূল(সা.) সাহরি খাওয়াকে বরকতময় বলার অন্যতম কারণ হলো- সাহরি খাওয়ার ফলে রোজাদার দিনভর উপবাস থাকলেও ইবাদতের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি যোগান নিতে পারে।
রোজার সাহরির আধ্যাত্মিক ফজিলত হচ্ছে, সাহরি খাওয়ার উপলক্ষে বান্দা আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে ঘুম থেকে ‍উঠে।আর এসময় আল্লাহ পাক দুনিয়ার আসমানে এসে ডেকে ডেকে বলেন,কেউ কি আছো যে আমায় ডাকছে? আমি তার ডাকে সাড়া দেবো। কেউ কি আছে আমার কাছে ক্ষমা চায়? আমি তাকে মাফ করে দেবো। এভাবে ভোর পর্যন্ত তিনি বান্দার রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের জন্য অবিরত ডেকে যান। তাই সেহেরির এসময় অনেক মূল্যবান ও বরকতপূর্ণ।
عن ابى هريرة ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال ينزل الله تبارك وتعالى الى السماء الدنيا كل ليلة حين يمضى ثلث الليل الاول-

অর্থঃ-প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হোরায়রা (রা) হতে বর্ণিত। নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন। প্রত্যেক রাতের প্রথম তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হওয়ার পর আল্লাহ তাবারাকা ও তা’য়ালা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন। (তিরমিজী ১ম খন্ড ১০০ পৃষ্ঠা)।

সাহরির উপকারিতাঃ-

০১.রামাদানের রোজর মধ্যে কষ্ট-ক্লান্তি কম হবে।
০২.তাতে ক্ষুৎ পিপাসার কাঠিন্যতা এড়ানো যাবে।
০৩.রোজায় অলসতা ও অনাগ্রহ দূর হবে।
০৪.গেস্টিক ও ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রনে রাখা সহজ হবে।
০৫.দিনে ইবাদত বন্দেগীতে উদ্যম ও আগ্রহ বাড়বে।
০৬.ফজরের নামাজের জামাতে যোগদান সহজ হবে।
০৭.তাহজ্জুদের নামাজ আদায়ের সুবিধা হবে।
০৮.বরকত ময় সময়ে ইবাদতের সুযোগ হবে।
০৯.আল্লাহর রহমত,বরকত ও ফিরিস্তাদের দোয়া প্রাপ্ত হবে।
১০.কাফিরদের রোজার সাথে পার্থক্য তৈরী হয়।

ইফতারের ফজিলত ও রোযাদারকে ইফতার করানোর মর্তবাঃ-

হাদীস শরীফে আছে-
عَنْ زَيْدِ بْنِ خَالِدٍ الْجُهَنِيِّ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا كَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ غَيْرَ أَنَّهُ لاَ يَنْقُصُ مِنْ أَجْرِ الصَّائِمِ شَيْئًا ‏”‏

অর্থঃ-যাইদ ইবনু খালিদ আল-জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ: তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ কোন রোযা পালনকারীকে যে লোক ইফতার করায় সে লোকের জন্যও রোযা পালনকারীর সমপরিমাণ সওয়াব রয়েছে। কিন্তু এর ফলে রোযা পালনকারীর সওয়াব থেকে বিন্দুমাত্র কমানো হবে না। (জামে’ আত-তিরমিজি, হাদিস নং ৮০৭)

عَنْ سَلْمَانَ بْنِ عَامِرٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ إِذَا كَانَ أَحَدُكُمْ صَائِمًا فَلْيُفْطِرْ عَلَى التَّمْرِ فَإِنْ لَمْ يَجِدِ التَّمْرَ فَعَلَى الْمَاءِ فَإِنَّ الْمَاءَ طَهُورٌ ‏”‏ ‏.‏

অর্থঃ-সালমান ইবনু ‘আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ: তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমাদের কেউ সওম রাখলে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে। খেজুর না পেলে পানি দিয়ে ইফতার করবে। কেননা পানি পবিত্রকারী। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২৩৫৫ )

শবে কদর -সর্বশ্রেষ্ঠ রজনী
শবে ক্বদরের মর্যাদা ও ফযিলত সম্পর্কে কুরআন হাদীসে অকাট্য অনেক দীলল প্রমান রয়েছেঃ-
আল্লাহ তায়ালা বলেন, إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ
অর্থাৎ আমি একে (কুরআন) অবর্তীণ করেছি শবে কদরে। (সূরা কাদর: ১)
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ
অর্থাৎ শবে কদর এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।(সূরা কাদর: ৩)

সূরা দোখানে আল্লাহ তায়ালা শবে কদরকে বরকতময় রাত বলে উল্লেখ করেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ-

حم (1) وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ (2) إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِينَ (3) فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ (4) أَمْرًا مِنْ عِنْدِنَا إِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ
অর্থাৎ ০১. হা-মিম ০২. শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের।০৩ আমি একে নাযিল করেছি। এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী,০৪.এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয় ০৫.আমার পক্ষ থেকে আদেশক্রমে, আমিই প্রেরণকারী। (সূরা দোখান ১-৫)
শবে কদরে রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগী করলে পূর্বের সকল ছোট গুনাহ মোচন হয়ে যায়,
সহিহ বুখারীর একটি হাদীসে আছেঃ-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ، وَمَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‏

অর্থঃ-আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি রমযানে ঈমানের সাথে ও সওয়াব লাভের আশায় সাওম পালন করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয় এবং যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে, সওয়াব লাভের আশায় লাইলাতুল ক্বদ্‌রে রাত জেগে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২০১৪)

শবে কদর হয় রামাযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে আয়েশা রা. হতে বর্ণিত: তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:-

عَنْ عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها ـ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ ‏”‏‏.‏ ‘

অর্থঃ-আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ: আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে লাইলাতুল ক্বদ্‌রের অনুসন্ধান কর।( সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২০১৭)
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি যদি জানতে পারি যে, কোন রাতটি লাইলাতুল কদর তাহলে তখন কোন দুয়াটি পাঠ করব? তিনি বললেন, তুমি বলঃ-
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ كَرِيمٌ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّى
অর্থাৎ “হে আল্লাহ, আপনি মহানুভব ক্ষমাশীল। আপনি ক্ষমা করা পছন্দ করেন। অত:এব আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।” (তিরমিজি)
এই রাতে কোরআন তেলাওয়াতের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। পবিত্র এই রাতেই মহাগ্রন্থ আল কোরআন অবতীর্ণ হয়। এ জন্য কোরআনের সঙ্গে এই রাতের সম্পর্ক ওতপ্রোত। অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় তেলাওয়াতের ফজিলত আত্মসমালোচনা বা আত্মবিচার এ রাতের বিশেষ আমল। আমরা নিজেই নিজের পর্যালোচনা করি, জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোতে আল্লাহর কতগুলো বিধান অমান্য করেছি।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে পবিত্র রামাদানের রহমত,ক্ষমা, নাজাত দান কর।

সংকলনেঃ-মোহাম্মদ আবদুল আজিজ মজুমদার
অধ্যক্ষ, হায়দরগঞ্জ তাহেরিয়া আর.এম.কামিল মাদ্রাসা

  •  
    40
    Shares
  • 40
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here