আজান,ইকামতে মাইক ব্যবহার:ইসলামী শরিয়ত কি বলে?

75

বিসমিল্লাহির রাহমানীর রাহীম।

ভূমিকাঃ-কোন কোন মুসলিম ভাই এ মর্মে ফতোয়া দিয়েছে যে,মাইকে আযান-ইক্বামাত, ওয়াজ-নছিহত,কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি করা জায়েয হবে না বরং তা শিরকে আকবর এবং হারাম হবে।এটা জানার পরও যারা এগুলো করবে তাদের দ্বারা জবাই করা,বিবাহ পড়ানো এবং তাদের পিছনে ইক্তেদা করা সমূর্ণরূপে হারাম হবে । অপর দিকে মাসজিদুল হারাম ,মাসজিদে নববী মাসজিদে আকসা সহ বিশ্বের প্রায় সকল মাসজিদ,সকল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী কেন্দ্রে মাইকে আযান-ইক্বামাত, ওয়াজ-নছিহত,কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি করা হচ্ছে।সকল মুসলিম দেশের সরকার তা অনুমোদন দিয়েছেন।তাই বিষয়টি আমরা কুরআন হাদীস ও ইসলামী ফিকহের আওতায় বিশ্লেষণ করতে ইচ্ছে করছি। আল্লাহ তাওফিক দাতা। প্রথমে আমরা আজান ইক্বামাতের বিষয়টি সামনে আনতে চাই।
০১ সহিহ বুখারীর একটি হাদীসে আছে-

عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي صَعْصَعَةَ الأَنْصَارِيِّ، ثُمَّ الْمَازِنِيِّ عَنْ أَبِيهِ، أَنَّهُ أَخْبَرَهُ أَنَّ أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِيَّ قَالَ لَهُ ‏ “‏ إِنِّي أَرَاكَ تُحِبُّ الْغَنَمَ وَالْبَادِيَةَ، فَإِذَا كُنْتَ فِي غَنَمِكَ أَوْ بَادِيَتِكَ فَأَذَّنْتَ بِالصَّلاَةِ فَارْفَعْ صَوْتَكَ بِالنِّدَاءِ، فَإِنَّهُ لاَ يَسْمَعُ مَدَى صَوْتِ الْمُؤَذِّنِ جِنٌّ وَلاَ إِنْسٌ وَلاَ شَىْءٌ إِلاَّ شَهِدَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ‏”‏‏.‏ قَالَ أَبُو سَعِيدٍ سَمِعْتُهُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم‏

অর্থঃ- আদুল্লাহ্ ইব্‌নু ‘আবদুর রহমান আনসারী মাযিনী(রহঃ)থেকে বর্ণিতঃ তাকে তার পিতা সংবাদ দিয়েছেন যে, আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)তাঁকে বললেন, আমি দেখছি তুমি বক্‌রী চরানো এবং বন-জঙ্গলকে ভালোবাসো। তাই তুমি যখন বক্‌রী নিয়ে থাকো বা বন-জঙ্গলে থাকো এবং সালাতের জন্য আযান দাও, তখন উচ্চকণ্ঠে আযান দাও। কেননা, জিন্, ইনসান বা যে কোন বস্তুই যতদূর পর্যন্ত মুয়ায্‌যিনের আওয়াজ শুনবে, সে কিয়ামাতের দিন তার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে। আবূ সা’ঈদ (রাঃ) বলেন, এ কথা আমি আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট শুনেছি। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৬০৯)
এ হাদীসে বলা হয়েছে- فَارْفَعْ صَوْتَكَ بِالنِّدَاءِ (উচ্চকণ্ঠে আযান দাও)।

০২। সুনানে আবু দাউদ এর একটি হাদীসে আছে-
عَبْدِ اللَّهِ بْنِ زَيْدِ بْنِ عَبْدِ رَبِّهِ، قَالَ حَدَّثَنِي أَبِي عَبْدُ اللَّهِ بْنُ زَيْدٍ، قَالَ لَمَّا أَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِالنَّاقُوسِ يُعْمَلُ لِيُضْرَبَ بِهِ لِلنَّاسِ لِجَمْعِ الصَّلاَةِ طَافَ بِي وَأَنَا نَائِمٌ رَجُلٌ يَحْمِلُ نَاقُوسًا فِي يَدِهِ فَقُلْتُ يَا عَبْدَ اللَّهِ أَتَبِيعُ النَّاقُوسَ قَالَ وَمَا تَصْنَعُ بِهِ فَقُلْتُ نَدْعُو بِهِ إِلَى الصَّلاَةِ ‏.‏ قَالَ أَفَلاَ أَدُلُّكَ عَلَى مَا هُوَ خَيْرٌ مِنْ ذَلِكَ فَقُلْتُ لَهُ بَلَى ‏.‏ قَالَ فَقَالَ تَقُولُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ حَىَّ عَلَى الصَّلاَةِ حَىَّ عَلَى الصَّلاَةِ حَىَّ عَلَى الْفَلاَحِ حَىَّ عَلَى الْفَلاَحِ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ قَالَ ثُمَّ اسْتَأْخَرَ عَنِّي غَيْرَ بَعِيدٍ ثُمَّ قَالَ وَتَقُولُ إِذَا أَقَمْتَ الصَّلاَةَ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ حَىَّ عَلَى الصَّلاَةِ حَىَّ عَلَى الْفَلاَحِ قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ فَلَمَّا أَصْبَحْتُ أَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَخْبَرْتُهُ بِمَا رَأَيْتُ فَقَالَ ‏”‏ إِنَّهَا لَرُؤْيَا حَقٌّ إِنْ شَاءَ اللَّهُ فَقُمْ مَعَ بِلاَلٍ فَأَلْقِ عَلَيْهِ مَا رَأَيْتَ فَلْيُؤَذِّنْ بِهِ فَإِنَّهُ أَنْدَى صَوْتًا مِنْكَ ‏”‏ ‏.‏ فَقُمْتُ مَعَ بِلاَلٍ فَجَعَلْتُ أُلْقِيهِ عَلَيْهِ وَيُؤَذِّنُ بِهِ
অর্থঃ-আবদুল্লাহ ইবনু যায়িদ থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ‘নাকুস’ (ঘণ্টা ধ্বনি) দিয়ে লোকদের সলাতের জন্য একত্র করার নির্দেশ দিলেন, তখন আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম, এক ব্যক্তি হাতে ঘণ্টা নিয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম, হে আল্লাহর বান্দা! ঘণ্টাটি বিক্রি করবে কি? লোকটি বললঃ তা দিয়ে তুমি কি করবে? আমি বললাম, আমরা এর সাহায্যে লোকদের সলাতের জন্য ডাকবো। লোকটি বললো, আমি কি তোমাকে এর চাইতে উত্তম জিনিস অবহিত করব না? আমি বললাম, অবশ্যই। লোকটি বললঃ তুমি বলবেঃ “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ; আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ, আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ, হাইয়্যা ‘আলাস সালাহ, হাইয়্যা আলাস সালাহ। হাইয়্যা আলাল ফালাহ, হাইয়্যা আলাল ফালাহ, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।” (অর্থঃ আল্লাহ মহান, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, (দু’বার) আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই (দু’বার), আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রসূল (দু’বার), এসো সালাতের দিকে (দু’বার), এসো সফলতার দিকে (দু’বার), আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই।) বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর লোকটি কিছুটা দূরে গিয়ে বলল, যখন সালাতের জন্য দাঁড়াবে তখন বলবেঃ “আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, আশাহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আশাহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ, হাইয়্যা আলাস সালাহ, হাইয়্যা আলাস ফালাহ, ক্বাদ ক্বামাতিস সালাতু ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ, আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ।” অতঃপর ভোর হলে আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট উপস্থিত হয়ে স্বপ্নে দেখা বিষয়টি অবহিত করি। তিনি বললেনঃ এটা সত্য স্বপ্ন, ইনশাআল্লাহ। তুমি উঠো, বিলালকে সাথে নিয়ে গিয়ে তুমি স্বপ্নে যা দেখেছো তা তাকে শিখিয়ে দাও, যেন সে (ঐভাবে) আযান দেয়। কারন তার কণ্ঠস্বর তোমার কণ্ঠস্বরের চেয়ে উচ্চ। অতঃপর আমি বিলালকে নিয়ে দাঁড়ালাম এবং তাকে (আযানের শব্দগুলো) শিখাতে থাকলাম। বিলাল ঐগুলো উচ্চেঃস্বরে বলতে লাগল। ( সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৯৯)
এ হাদীসে বলা হয়েছে- فَلْيُؤَذِّنْ بِهِ فَإِنَّهُ أَنْدَى صَوْتًا مِنْكَ ‏”‏ – যেন সে বেলাল ( রাঃ) ঐভাবে আযান দেয়। কারন তার কণ্ঠস্বর তোমার কণ্ঠস্বরের চেয়ে উচ্চ।

০৩। সুনানে আন-নাসায়ী এর একটি হাদীসে আছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ سَمِعَهُ مِنْ فَمِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «الْمُؤَذِّنُ يُغْفَرُ لَهُ بِمَدِّ صَوْتِهِ وَيَشْهَدُ لَهُ كُلُّ رَطْبٍ وَيَابِس
অর্থঃ- আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম -কে বলতে শুনেছেন যে, মুয়ায্‌যিনের আওয়াজের দূরত্ব পরিমাণ করে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে এবং প্রত্যেক শুষ্ক ও আর্দ্র জিনিস (অর্থাৎ জীবন্ত ও মৃত প্রত্যেক জিনিস) তার (ঈমানের) পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করবে। (সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস নং ৬৪৫)
এ হাদীসে আজানের স্বর উচ্চ করে দূরে পৌঁছানোর অনুপ্রেরণা দেয়া হয়েছে।

০৪।সহিহ মুসলিম এর একটি হাদীসে আছে-
عَوْنُ بْنُ أَبِي جُحَيْفَةَ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ أَتَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم بِمَكَّةَ وَهُوَ بِالأَبْطَحِ فِي قُبَّةٍ لَهُ حَمْرَاءَ مِنْ أَدَمٍ – قَالَ – فَخَرَجَ بِلاَلٌ بِوَضُوئِهِ فَمِنْ نَائِلٍ وَنَاضِحٍ – قَالَ – فَخَرَجَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَلَيْهِ حُلَّةٌ حَمْرَاءُ كَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَى بَيَاضِ سَاقَيْهِ – قَالَ – فَتَوَضَّأَ وَأَذَّنَ بِلاَلٌ – قَالَ – فَجَعَلْتُ أَتَتَبَّعُ فَاهُ هَا هُنَا وَهَا هُنَا – يَقُولُ يَمِينًا وَشِمَالاً – يَقُولُ حَىَّ عَلَى الصَّلاَةِ حَىَّ عَلَى الْفَلاَحِ – قَالَ – ثُمَّ رُكِزَتْ لَهُ عَنَزَةٌ فَتَقَدَّمَ فَصَلَّى الظُّهْرَ رَكْعَتَيْنِ يَمُرُّ بَيْنْ يَدَيْهِ الْحِمَارُ وَالْكَلْبُ لاَ يُمْنَعُ ثُمَّ صَلَّى الْعَصْرَ رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ لَمْ يَزَلْ يُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ حَتَّى رَجَعَ إِلَى الْمَدِينَةِ
অর্থঃ-আওন ইবনু আবূ জুহাইফাহ্‌ (রাঃ) থেকে তার পিতার সূত্র থেকে বর্ণিতঃ: তিনি (জুহাইফাহ্‌) বলেন, আমি মাক্কায় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর কাছে আসলাম। তিনি তখন আব্‌তাহ (মুহাসসাব) নামক স্থানে লাল চামড়ার তৈরি একটি তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন। রাবী বলেন, বিলাল (রাঃ) তাঁর উযূর পানি নিয়ে আসলেন। কেউ পানি পেল, কেউ পেল না- সে অন্যের কাছ থেকে সামান্য নিয়ে নিল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বের হয়ে আসলেন। তাঁর গায়ে লাল রং এর চাদর শোভা পাচ্ছিল। আমি যেন তাঁর পায়ের গোছার শুভ্রতা এখনো দেখতে পাচ্ছি। তিনি ওযূ করলেন এবং বিলাল (রাঃ) আযান দিলেন। আমি তার (বিলালের) অনুসরণ করে এদিকে-ওদিক মুখ ঘুরাতে লাগলাম। সে ডানে বাঁয়ে মুখ ঘুরিয়ে “হাইয়্যা ‘আলাস সলাহ” ও “হাইয়্যা ‘আলাল ফালাহ” বলল। রাবী বলেন, অতঃপর একটি বর্শা দাঁড় করিয়ে পুঁতে দেয়া হলো। তিনি সামনে অগ্রসর হয়ে যুহরের দু’রাক’আত (ফরয) সলাত আদায় করলেন। তাঁর (সুত্‌রার) সামনে দিয়ে গাধা, কুকুর ইত্যাদি যাচ্ছিল কিন্তু তিনি বাধা দিলেন না। অতঃপর তিনি আস্‌রের ফরয সলাত ও দু’রাক’আত পড়লেন। মাদীনায় ফিরে আসার সময় পর্যন্ত তিনি এভাবে দু’রাক’আত করে সলাত আদায় করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১০০৬)
এ হাদীসে ডানে বাঁয়ে মুখ ঘুরিয়ে “হাইয়্যা আলাস সলাহ” ও “হাইয়্যা আলাল ফালাহ” বলা হয়েছে আজানের স্বর দূরে পৌঁছানোর জন্য।

০৫।সুনানে ইবনে মাজাহ, এর একটি হাদীসে আছে-
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ أَمَرَ بِلاَلاً أَنْ يَجْعَلَ إِصْبَعَيْهِ فِي أُذُنَيْهِ وَقَالَ ‏ “‏ إِنَّهُ أَرْفَعُ لِصَوْتِكَ
অর্থঃ- রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিলাল (রাঃ)– কে তার দু’কানের ছিদ্রে তার দু’ আঙ্গুল প্রবিষ্ট করার নির্দেশ দেন এবং বলেন, তাতে তোমার কণ্ঠস্বর আরো উচ্চ হবে।(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৭১০)
এ হাদীসে আজানে কণ্ঠস্বর আরো উচ্চ করার জন্য কানে আঙ্গুল প্রবেশ করানোর জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

০৬।সুনানে আবু দাউদ এর আরেকটি হাদীসে আছে
عَنِ امْرَأَةٍ، مِنْ بَنِي النَّجَّارِ قَالَتْ كَانَ بَيْتِي مِنْ أَطْوَلِ بَيْتٍ حَوْلَ الْمَسْجِدِ وَكَانَ بِلاَلٌ يُؤَذِّنُ عَلَيْهِ الْفَجْرَ فَيَأْتِي بِسَحَرٍ فَيَجْلِسُ عَلَى الْبَيْتِ يَنْظُرُ إِلَى الْفَجْرِ فَإِذَا رَآهُ تَمَطَّى ثُمَّ قَالَ اللَّهُمَّ إِنِّي أَحْمَدُكَ وَأَسْتَعِينُكَ عَلَى قُرَيْشٍ أَنْ يُقِيمُوا دِينَكَ قَالَتْ ثُمَّ يُؤَذِّنُ قَالَتْ وَاللَّهِ مَا عَلِمْتُهُ كَانَ تَرَكَهَا لَيْلَةً وَاحِدَةً تَعْنِي هَذِهِ الْكَلِمَاتِ ‏
অর্থঃ-বানু নাজ্জারের এক মহিলা থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মসজিদের নিকটবর্তী আমার ঘরটিই ছিল সবচেয়ে উচুঁ। বিলাল (রাঃ) ঘরের ছাদে উঠে ফাজ্‌রের আযান দিতেন। তিনি সাহরীর সময় (শেষ রাতে) সেখানে এসে বসতেন এবং সুবহে সাদিকের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন। সুবহে সাদিক হয়ে গেলে তিনি শরীরের আড়মোড় ভেঙ্গে (বা হাই তুলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে) বলতেন : হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রশংসা করছি এবং কুরাইশদের ব্যাপারে আপনার কাছে সাহায্য চাইছি যেন তাদের দ্বারা আপনার দ্বীন কায়িম হয়। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তিনি আযান দিতেন। বর্ণনাকারী আরো বলেন, আল্লাহর শপথ কোন রাতেই আমি বিলালকে এ কথাগুলো ত্যাগ করতে দেখিনি।( সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৫১৯)
এ হাদীসে আজানের ধ্বনি সম্প্রসারনের জন্য সবচেয়ে উচুঁ ঘরের ছাদকে মিনার হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে।পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরামের যুগে মসজিদের সাথে আজানের স্বর উচুস্থান থেকে প্রচারের জন্য মিনারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রিয় পাঠক হাদীস সমূহের ইবারত ও বর্ণনা ভঙ্গি চিন্তা করলে একথা প্রতিয়মান হয় যে, ইসলামে আজান প্রবর্তন করার উদ্দেশ্য হলো, এর মাধ্যমে নামাজিদের নামাযের সময় হওয়া সম্পর্কে অবগত করা এবং নামাজের জন্য আহবান করা। বলাবাহুল্য, আজানের আওয়াজ যত উচ্চ হবে ততবেশী মানুষ নামাযের সময় সম্পর্কে অবগত হবে এবং নামাযের দাওয়াত ততবেশী মানুষের নিকট পৌঁছবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময়ে স্বর উচুকরার যত রকম মাধ্যম ছিল আজানের স্বর উঁচু করার ও সম্প্রসারনের জন্য সম্ভাব্য সব মাধ্যমই ব্যবহার করা হয়েছে।
ফিকহের কিতাব সমূহে আজান সংক্রান্ত শরিয়তের বিভিন্ন হুকুম থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়। যেমন,أذان فى الصومعة অর্থাৎ-ঘরে আজান দিলে সে ক্ষেত্রে জানালা দিয়ে মাথা বের করে আজান দেয়ার আদেশ রয়েছে,যেন আজানের আওয়াজ দূর পর্যন্ত পৌঁছে। এ যুগে মাইক একটি বৈদ্যুতিক জানালার স্থলাভিসিক্ত।আরো একটি বিষয় হলো যে, আজানকে দাওয়াতে তাম্মাহ তথা পরিপূর্ণ আহবান বলা হয়েছে।তাহলে আজান যেহেতু দাওয়াত, তাই যতদূর পর্যন্ত সম্ভব তার প্রচার হওয়া কাম্য । সুতরাং মাইকে আজান দেয়ার বৈধতা নিয়ে কোনো বিরোধ থাকতে পারেনা বরং মাইকে আজান দেয়া উত্তম হওয়াই যুক্তিযুক্ত। কেননা, তাতে শরিয়তের উদ্দেশ্য, মুখে আজান দেয়ার চেয়ে বেশী প্রতিফলিত হয়। যেহেতু মাসজিদুল হারাম,মাসজিদে নববী মাসজিদে আকসা সহ বিশ্বের প্রায় সকল মাসজিদ,সকল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী কেন্দ্রে মাইকে আযান-ইক্বামাত, ওয়াজ-নছিহত,কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি করা হচ্ছে এবং সকল মুসলিম দেশের সরকার তা অনুমোদন দিয়েছেন সেহেতু তা অবশ্যই বৈধ ও উত্তম। হাদীসের প্রখ্যাত কিতাব তাবরানী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রাঃ)থেকে একটি হাদীস বর্ণিত আছে-
عن عبدالله بن مسعود قَالَ ما رآهُ المسلِمونَ حسنًا فَهوَ عندَ اللَّهِ حسنٌ وما رآهُ المسلِمونَ قبيحًا فَهوَ عندَ اللَّهِ قبيحٌ
অর্থঃ-হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রাঃ)থেকে বর্ণিত তিনি বলেন মুসলমানগণ যাকে উত্তম মনে করে তা আল্লাহর কাছে উত্তম এবং মুসলমানগণ যাকে কদর্য মনে করে তা আল্লাহর নিকটও খারাপ।(তাবরানী,আল-ম’জামুল ওয়াসিত হাদীস নং-৩৬০২)

ফিকহের রায়ঃ-
আল-বাদায়ে –উস-সানায়ে নামক বিখ্যাত ফিকহের কিতাবে এরূপ ধারণাই বর্ণিত আছে-
أما الذي يرجع إلى نفس الأذان فأنواع منها أن يجهر بالأذان فيرفع به صوته لأن المقصود وهو الإعلام يحصل به ألا ترى أن النبي صلى الله عليه وسلم قال لعبد الله بن زيد علمه بلالا فإنه أندى وأمد صوتا منك … وكذا يجهر بالإقامة لكن دون الجهر بالأذان لأن المطلوب من الأعلام بها دون المقصود من
الأذان. ) بدائع الصنائع : ১/ ১৪৯)

উপসংহারঃ- গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে বুঝা যাবে মাইক ব্যবহার করলে আজানের মূল কাঠামোতে কোন বৃদ্ধি-কমতী,যুক্ত-বিযুক্ত হচ্ছেনা বরং তা একটি বাহ্যিক সহায়ক বিষয়। তাই শিরক-বেদায়াত বা নাজায়েজ হওয়ার কোন কারণ থাকতে পারেনা । হারাম ও মাআজানেমশিরক ফতোয়া সঠিক নয়৷ ফতোয়া দান কারী হারাম ও শিরক এর সংজ্ঞাই জানে না৷ ইসলাম ধর্মে, শিরক অর্থ “বিকল্প প্রতিবর্ণীকরণ।”( شرك‎‎ ) পৌত্তলিকতা বা বহুঈশ্বরবাদ চর্চা করার পাপকে বুঝায়। অর্থাৎ শির্‌ক হল আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে উপাস্য হিসেবে সাব্যস্ত করা বা তার উপাসনা করা। শাব্দিকভাবে এর দ্বারা এক বা একাধিক কোন কিছুকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও কর্তৃত্বের অংশীদার সাব্যস্ত করাকে বুঝায়। এটি তাওহীদের পরিপন্থী একটি বিষয়। মাইকে আজানের সাথে এর দূরতম সম্পর্কও নাই। সুতরাং এ মতবাদে বিশ্বাসীদের থেকে দুরে থাকা একান্ত জরুরী বা কর্তব্য৷
ﻭ الله اعلم بالصواب واليه المرجع والماب

সংগ্রহ ও সংকলনেঃ

মোহাম্মদ আবদুল আজিজ মজুমদার
অধ্যক্ষ, হায়দরগঞ্জ তাহেরিয়া আর.এম.কামিল মাদ্রাসা

দেশ জার্নাল /এস.এম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here