পুত্রবধূ ও শাশুড়ির সম্পর্ক ! ইসলাম কি বলে ?

293

(সংগ্রহ ও সংকলনেঃ-মোহাম্মদ আবদুল আজিজ মজুমদার

বিসমিল্লাহির রাহমানীর রাহীম।

ভূমিকাঃ-বৌমাকে মনে রাখতে হবে যে,তার শশুর,শাশুড়ির খোরপোষ তার স্বামীর উপর ফরজ।হাদীসে আছে-

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، عَنِ النَّبِيِّ – صلى الله عليه وسلم – قَالَ«رِضَا اللَّهِ فِي رِضَا الْوَالِدَيْنِ، وَسَخَطُ اللَّهِ فِي سَخَطِ الْوَالِدَيْنِ

অর্থঃ-আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল আস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মাতা-পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুটি (লাভ হয়), তাঁদের অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি রয়েছে।(বুলুগুল মারাম, হাদিস নং ১৪৫৭ হাদিসের মান:- সহিহ হাদিস)

আবার শশুর-শাশুড়ির একথা মনে রাখতে হবে যে, তাদের বৌমার খোরপোষ তাদের ছেলের উপর ফরজ।

আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-

وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ

অর্থঃ-আর সন্তানের অধিকারী অর্থাৎ, পিতার উপর হলো সে সমস্ত নারীর(সন্তানের মায়েদের)খোর-পোষের দায়িত্ব প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী।(সূরা আল বাক্বারাহ:-২৩৩ )

আল্লাহ তা’য়ালা আরও বলেন-

أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنْتُمْ مِنْ وُجْدِكُمْ وَلَا تُضَارُّوهُنَّ لِتُضَيِّقُوا عَلَيْهِنَّ

অর্থঃ- তোমরা তোমাদের সামর্থ অনুযায়ী যেরূপ গৃহে বাস কর, তাদেরকেও বসবাসের জন্যে সেরূপ গৃহ দাও।তাদেরকে কষ্ট দিয়ে সংকটাপন্ন করো না। (সূরা আত্ব-ত্বালাক্ব:-৬)

শ্বশুর-শাশুড়িসহ মুরুব্বীদের প্রতি বৌমার সম্মান বোধ থাকা আবশ্যকঃ-

শ্বশুর-শাশুড়ি অবশ্যই বয়ঃবৃদ্ধ ও মুরুব্বী শ্রেণীর মানুষ। আবার বৌমাও একদিন শাশুড়ি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআন ও হাদীসে অনেক আয়াত ও বাণী আছে!

আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
ثُمَّ كَانَ عَاقِبَةَ الَّذِينَ أَسَاءُوا السُّوأَى

অর্থঃ-অতঃপর যারা মন্দ কর্ম করত, তাদের পরিণাম হয়েছে মন্দ। (সূরা আর-রূম-১০) {বুঝা গেল বৌমা শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে যেমন মন্দ ব্যবহার করবে নিজে শাশুড়ি হলে তখন সেরূপ মন্দ ব্যবহারই পাবে!}

আল্লাহ তা’য়ালা আরও বলেন-
هَلْ جَزَاءُ الْإِحْسَانِ إِلَّا الْإِحْسَانُ
অর্থঃ-সৎকাজের প্রতিদান উত্তম পুরস্কার ব্যতীত কি হতে পারে (সূরা আর রহমান:৬০) {বুঝা গেল বৌমা শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে যেমন ভালো ব্যবহার করবে নিজে শাশুড়ি হলে তখন সেরূপ ভালো ব্যবহারই পাবে!}
হাদীসে আছে-
قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيُوَقِّرْ كَبِيرَنَا ‏

অর্থঃ-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ যে লোক আমাদের শিশুদের আদর করে না এবং আমাদের বড়দের প্রতি সন্মান প্রদর্শন করে না সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। (জামে’ আত-তিরমিজি, হাদিস নং ১৯১৯) {এখানে বৌমা ও শ্বশুর-শাশুড়ি সকলেরই দায়িত্বের কথা ব্যক্ত হয়েছে!}

عَنْ أَبِي مُوسَى الأَشْعَرِيِّ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ إِنَّ مِنْ إِجْلاَلِ اللَّهِ إِكْرَامَ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ وَحَامِلِ الْقُرْآنِ غَيْرِ الْغَالِي فِيهِ وَالْجَافِي عَنْهُ وَإِكْرَامَ ذِي السُّلْطَانِ الْمُقْسِطِ ‏

অর্থঃ-আবূ মূসা আল-আশ‘আরী (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহি ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই বৃদ্ধ মুসলিমকে সম্মান করা, কুরআনের ধারক-বাহক ও ন্যায়পরায়ণ শাসকের প্রতি সম্মান দেখানো মহান আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অন্তর্ভুক্ত।(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৮৪৩ )

عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ، قَالَ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏ “‏ ابْغُونِي ضُعَفَاءَكُمْ فَإِنَّمَ تُرْزَقُونَ وَتُنْصَرُونَ بِضُعَفَائِكُمْ ‏

অর্থঃ-আবুদ দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম – কে বলতে শুনেছিঃ আমাকে খোঁজ কর তোমাদের মধ্যে যারা নিঃস্ব-দুর্বল তাদের মাঝে। কেননা তোমরা রিযিক এবং সাহায্য-সহযোগীতাপ্রাপ্ত হয়ে থাক অসহায়-দুর্বল লোকদের ওয়াসিলায়। (জামে’ আত-তিরমিজি, হাদিস নং ১৭০২)
শ্বশুর-শাশুড়ি শারিরিক ও মানুষিক ভাবে দূর্বল শ্রেণিরই অর্ন্তভূক্ত। হাদীসের মর্মানুযায়ী তাঁদের ওয়াসিলায় পরিবারে রিযিক আসে।

মুরব্বীদের সেবাযত্ন নিশ্চয়ই পূণ্যের কাজ,যার প্রতিদান অব্শ্যই পাওয়া যাবে।আল্লাহ বলেন-
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
অর্থঃ-যে সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং সে ঈমাণদার, পুরুষ হোক কিংবা নারী আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং প্রতিদানে তাদেরকে তাদের উত্তম কাজের কারণে প্রাপ্য পুরষ্কার দেব যা তারা করত।(সূরা নাহল:৯৭)
শ্বশুর-শাশুড়ির সেবাযত্ন এবং শ্বশুর-শাশুড়ি / পুত্রবধূ ও ননদ-ভাবীর পারস্পরিক সম্পর্কঃ-
স্বামীর মা-বাবাকে নিজের মা-বাবার মতো সম্মান-মর্যাদা ও সমীহের চোখে দেখা বৌমার কর্তব্য। মনেপ্রাণে তাদের ভালোবাসা এবং তাদের সেবাযত্ন করা তার কল্যাণ ও সৌভাগ্যের কারণ হবে। অনুরূপ শ্বশুর-শাশুড়িও পুত্রবধূকে নিজের মেয়ের মতো আদরযত্ন ও খাতির করা এবং তার থাকা-খাওয়া ও সুখ-সুবিধার প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখা জরুরি। যৌথ পরিবারগুলোতে পুত্রবধূরা শ্বশুর-শাশুড়ির সেবাযত্ন করে থাকেন। এটাকে সমাজে পারিবারিক দায়িত্ব হিসেবেও মনে করা হয়ে থাকে। এটা আমাদের সমাজের আবহমান কালের রীতি।
শ্বশুর-শাশুড়ির সংসার থেকে আলাদা হলেও পুত্রবধূ তাদের দেখাশোনা করেন। শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করার এ রীতি সাহাবায়ে কেরামের জীবনেও দেখা যায়। হাদীসে আছে-
عَنْ كَبْشَةَ بِنْتِ كَعْبِ بْنِ مَالِكٍ، – وَكَانَتْ تَحْتَ ابْنِ أَبِي قَتَادَةَ – أَنَّ أَبَا قَتَادَةَ، دَخَلَ فَسَكَبَتْ لَهُ وَضُوءًا فَجَاءَتْ هِرَّةٌ فَشَرِبَتْ مِنْهُ فَأَصْغَى لَهَا الإِنَاءَ حَتَّى شَرِبَتْ قَالَتْ كَبْشَةُ فَرَآنِي أَنْظُرُ إِلَيْهِ فَقَالَ أَتَعْجَبِينَ يَا ابْنَةَ أَخِي فَقُلْتُ نَعَمْ ‏.‏ فَقَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ إِنَّهَا لَيْسَتْ بِنَجَسٍ إِنَّهَا مِنَ الطَّوَّافِينَ عَلَيْكُمْ وَالطَّوَّافَاتِ ‏”‏ ‏.
অর্থঃ-কাবশাহ বিন্‌তে কা’ব ইব্‌নে মালিক (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ (তিনি ছিলেন আবূ ক্বাতাদাহ (রাঃ)-এর পুত্রবধূ।) তিনি বলেন, একদা আবূ ক্বাতাদাহ (বাহির থেকে) আসলে আমি তার জন্য উযুর পানি দিলাম। এমন সময় একটি বিড়াল এসে তা থেকে পানি পান করতে লাগল। আবূ ক্বাতাদাহ বিড়ালের জন্যে পাত্রটি কাত করে ধরলেন। ফলে বিড়ালটি তৃপ্তি সহকারে পান করল। কাবশাহ বলেন, আবূ ক্বাতাদাহ দেখলেন, আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। তিনি বললেন, হে ভাতিজী! তুমি কি আশ্চর্যবোধ করছ? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ বিড়াল অপবিত্র নয়। এরা সর্বদা তোমাদের কাছে ঘুরাফেরাকারী প্রাণী। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৭৫)

হাদীসে ননদ-ভাবীর সুসম্পর্কেরও উৎকৃষ্ট উদাহরণ আছে-

عَنْ جَابِرٍ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ هَلَكَ أَبِي وَتَرَكَ سَبْعَ ـ أَوْ تِسْعَ ـ بَنَاتٍ، فَتَزَوَّجْتُ امْرَأَةً فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ تَزَوَّجْتَ يَا جَابِرُ ‏”‏‏.‏ قُلْتُ نَعَمْ‏.‏ قَالَ ‏”‏ بِكْرًا أَمْ ثَيِّبًا ‏”‏‏.‏ قُلْتُ ثَيِّبًا‏.‏ قَالَ ‏”‏ هَلاَّ جَارِيَةً تُلاَعِبُهَا وَتُلاَعِبُكَ، أَوْ تُضَاحِكُهَا وَتُضَاحِكُكَ ‏”‏‏.‏ قُلْتُ هَلَكَ أَبِي فَتَرَكَ سَبْعَ ـ أَوْ تِسْعَ ـ بَنَاتٍ، فَكَرِهْتُ أَنْ أَجِيئَهُنَّ بِمِثْلِهِنَّ، فَتَزَوَّجْتُ امْرَأَةً تَقُومُ عَلَيْهِنَّ‏.‏ قَالَ ‏”‏ فَبَارَكَ اللَّهُ عَلَيْكَ

অর্থঃ-জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন- আমার আব্বা সাত অথবা নয়জন মেয়ে রেখে মারা যান। তারপর আমি এক নারীকে বিয়ে করি। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি কি বিয়ে করেছ? আমি বললামঃ হাঁ। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, সে নারী কুমারী না অকুমারী? আমি বললামঃ অকুমারী। তিনি বললেন, তুমি একজন কুমারী বিয়ে করলে না কেন? তা হলে তুমি তার সঙ্গে ক্রীড়া কৌতুক করতে এবং সেও তোমার সঙ্গে ক্রীড়া কৌতুক করত। আর তুমি তার সঙ্গে এবং সেও তোমার সঙ্গে হাসি-তামাশা করতো। আমি বললামঃ আমার পিতা সাত অথবা নয়জন মেয়ে রেখে মারা গেছেন। কাজেই আমি এটা পছন্দ করলাম না যে, তাদের মত কুমারী বিয়ে করে আনি। এজন্য আমি এমন এক নারীকে বিয়ে করেছি যে তাদের তত্ত্বাবধান করতে পারবে। তখন তিনি দু’আ করলেনঃ আল্লাহ! তোমাকে বারাকাত দান করুন। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৬৩৮৭) {ননদ-ভাবীর সুস্পর্কের পরিবারের জন্য রাসূলুল্লাহর (স.) পক্ষথেকে বরকতের দোয়া আছে!}

ইসলামী শরিয়তের আইনী বিধানঃ-

তবে ইসলামী শরিয়তের আইনী বিধানে শ্বশুর-শাশুড়ি ও ঘরের অন্যান্যদের সেবা স্ত্রীর অতিরিক্ত একটি কাজ। এটা তার দায়িত্ব নয়। ইসলামী চিন্তাবিদ (স্কলার) আলেমগণ বলেন-

ولا تجب على زوجة الابن خدمة أم الزوج ولا رعايتها، ولا تأثم إذا امتنعت عن ذلك

অর্থঃ-“পুত্রবধুর জন্য স্বামীর মায়ের খেদমত ও সেবাযত্ন করা আবশ্যক নহে!সে তা অস্বীকার করলে গুনাগার হবেনা”।
কিন্তু বর্তমান সমাজ বিষয়টাকে অপরিহার্য দায়িত্ব মনে করছে কিংবা এটিই তার প্রধান দায়িত্ব এমন ভাবছে। অনেক জায়গায় ছেলের জন্য বউ আনা হয়-ই শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করার জন্য। এগুলো নায্য ও পরিমিতিবোধের লঙ্ঘন। কারণ মা-বাবার সেবা করা সন্তানের দায়িত্ব, পুত্রবধূর নয়।
মনে রাখতে হবে শ্বশুর-শাশুড়ীর খেদমত করা আইনতঃ ফরয না হলেও নৈতিক ফরয! শ্বশুরবাড়ীর লোকদেরও ভুলে গেলে চলবে না,পুত্রবধু শ্বশুর বাড়ীর সেবিকা বা চাকরানী নয়। তাকেই গামলাভর্তি কাপড় ধুইতে হবে, ঘর-দুয়ার, থালা-বাসন পরিষ্কার থেকে শুরু করে সবকাজ করতে হবে-এমনটি নয়।সেও একটি মানুষ,তাঁরও আছে স্বাদ,আনন্দ-আহলাদ । দরকার আছে বিশ্রামেরও। তারও শশুর-শাশুড়ী ও ননদদের সাথে একত্রে বসে খাওয়ার অধিকার ও ইচ্ছা আছে! শশুর,শাশুড়ী,ননদ,দেবর ও ভাসুর-তাদের সন্তান সবাই ঘরের বৌ থেকে খেদমত নেয়াটা তাদের মৌলিক অধিকার মনে করে।বৌ তার স্বামী-সন্তানের খেদমত করল কি করল না, সেটা বড় বিষয় নয়। পরিবারের অন্যদের খেদমত হল কি না সেটাই বড় বিষয়। অনেক পরিবারে বৌ আসার পর কাজের লোক রাখার প্রয়োজন অনুভব করা হয় না।পুত্রবধু শশুর-শাশুড়ীকে আপন পিতা-মাতার মত তখনি মনে করবে,যখন শশুর-শাশুড়ীও তাকে আপন মেয়ের মত মনে করবে। নিজের মেয়ে কবিরা গুনাহ করলে তার দোষ গোপন আর পুত্রবধুর রান্নায় সামান্য দোষ হলে তা অন্যের নিকট বলার আচরণ কখনোই কাম্য নয় । আসলে একটি সুখী পরিবার গঠনে বৌমা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্য- উভয়দিক থেকেই ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ কাম্য।

গৃহের কাজে মহিলা সাহাবীগণের জীবনাদর্শঃ-

বৈবাহিক সম্পর্ক শুধুমাত্র নিয়ম রক্ষার নয়। বরং দাম্পত্য জীবন হৃদয় ও আত্মার বন্ধন। কেবল আইন পালন ও নিয়ম রক্ষার মাধ্যমে পারিবারিক সুখ-সমৃদ্ধি টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই যখন রাসুল (সাঃ) ও তার সাহাবিদের সুন্নাতের অনুসরণ করবে, তখন তাদের জীবনে শান্তি-আনন্দ ও সুখের হাওয়া বইবে। রাসুল (সা.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সমাজে রান্নাবান্নার কাজ নারীরাই আঞ্জাম দিতেন। রাসুল (সা.)-এর পবিত্র স্ত্রী-কন্যারাও ঘরের কাজ তারা নিজেরাই করতেন। বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসুল (সাঃ) রান্না বান্নার কাজে ঘরের মানুষদের সহযোগিতা করতেন। রাসুল (সা.)-এর পবিত্র স্ত্রী-কন্যারাও ঘরের কাজ তারা নিজেরাই করতেন।

নবী তনয়া ফাতেমা (রাঃ) নারীদের আদর্শঃ-

আদরের প্রিয় কন্যা ফাতেমা (রা.)-কে প্রিয় নবী (সা.) স্বামীগৃহে পাঠানোর পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কাজ ভাগ করে দিয়ে বলেছিলেন, ঘরের ভেতরের কাজ স্ত্রী করবে আর বাইরের কাজ করবে স্বামী।
হাদিসে আছে,
حَدَّثَنَا عَلِيٌّ، أَنَّ فَاطِمَةَ ـ عَلَيْهَا السَّلاَمُ ـ اشْتَكَتْ مَا تَلْقَى مِنَ الرَّحَى مِمَّا تَطْحَنُ، فَبَلَغَهَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أُتِيَ بِسَبْىٍ، فَأَتَتْهُ تَسْأَلُهُ خَادِمًا فَلَمْ تُوَافِقْهُ، فَذَكَرَتْ لِعَائِشَةَ، فَجَاءَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَذَكَرَتْ ذَلِكَ عَائِشَةُ لَهُ، فَأَتَانَا وَقَدْ دَخَلْنَا مَضَاجِعَنَا، فَذَهَبْنَا لِنَقُومَ فَقَالَ ‏”‏ عَلَى مَكَانِكُمَا ‏”‏ حَتَّى وَجَدْتُ بَرْدَ قَدَمَيْهِ عَلَى صَدْرِي فَقَالَ ‏”‏ أَلاَ أَدُلُّكُمَا عَلَى خَيْرٍ مِمَّا سَأَلْتُمَاهُ، إِذَا أَخَذْتُمَا مَضَاجِعَكُمَا فَكَبِّرَا اللَّهَ أَرْبَعًا وَثَلاَثِينَ، وَاحْمَدَا ثَلاَثًا وَثَلاَثِينَ، وَسَبِّحَا ثَلاَثًا وَثَلاَثِينَ، فَإِنَّ ذَلِكَ خَيْرٌ لَكُمَا مِمَّا سَأَلْتُمَاهُ

অর্থঃ-আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ ফাতিমা (রাঃ) আটা পিষার কষ্টের কথা জানান। তখন তাঁর নিকট সংবাদ পৌঁছে যে, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর নিকট কয়েকজন বন্দী আনা হয়েছে। ফাতিমা (রাঃ) আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর নিকট এসে একজন খাদিম চাইলেন। তিনি তাঁকে পেলেন না। তখন তিনি ‘আয়িশা (রাঃ) -এর নিকট তা উল্লেখ করেন। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এলে ‘আয়িশা (রাঃ) তাঁর নিকট বিষয়টি বললেন। (রাবী হযরত আলী রা. বলেন) আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট এলেন। তখন আমরা শুয়ে পড়েছিলাম। আমরা উঠতে চাইলাম। তিনি বললেন, তোমরা নিজ নিজ জায়গায় থাক। আমি তাঁর পায়ের শীতলতা আমার বুকে অনুভব করলাম। তখন তিনি বললেন, ‘তোমরা যা চেয়েছ, আমি কি তোমাদের তার চেয়ে উত্তম জিনিসের সন্ধান দিব না? যখন তোমরা বিছানায় যাবে, তখন চৌত্রিশ বার ‘আল্লাহু আকবর’ তেত্রিশবার ‘আলহামদু লিল্লাহ’ এবং তেত্রিশবার ‘সুব্‌হানাল্লাহ’ বলবে, এটাই তোমাদের জন্য তার চেয়ে উত্তম, যা তোমরা চেয়েছ। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৩১১৩ )
একটি পরিবারকে সুন্দর রাখতে পুরুষের চাইতে নারীর ভূমিকাই মুখ্য। এমনকি বুখারী ও মুসলিম শরীফে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى بَيْتِ بَعْلِهَا وَوَلَدِهِ وَهْىَ مَسْئُولَةٌ عَنْهُمْ

অর্থঃ- স্ত্রী স্বামীর ঘরের এবং তার সন্তানের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২৫৫৪)
আবার পুত্রবধূর কোনো সন্তান জন্ম নিলে দাদা-দাদি বৃদ্ধ বয়সেও নাতি-নাতনির জন্য অনেক শ্রম ব্যয় করেন। আদর-যত্নে তাদের দেখাশোনা করেন। কিন্তু এটা তাদের আইনত দায়িত্ব নয়। তবুও তারা এ‘দায়িত্ব’ পালন করে থাকেন। মূলতঃ এ ক্ষেত্রে নৈতিকতা ও মানবতাবোধের কারণে তারা এমন করেন।

বৌমার স্বামী তথা শ্বশুর –শাশুড়ির পুত্রের দায়িত্বঃ-

বৌ ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভারসাম্যহীন আচরণ কাম্য নয়। স্বামী/পুত্র অনেক সময় হয়ে যায় শাখের করাত। না পরে বধুকে বুঝাতে ! আবার না পারে মাকে বুঝাতে!! তারা সকলে মিলে স্বামী/পুত্রকে মানসিক চাপমুক্ত রাখতে পারে!“ বৈকি? মা আপনাকে দশমাস গর্ভে ধারণ করলো, আড়াই বছর বুকের দুধ খাওয়ালো, নিজে না খেয়ে আপনাকে খাওয়ালো, আপনার পেশাব পায়খানা সাফ করলো, হাটা চলা কথা বলা শিখালো, আপনি অসুস্হ হলে রাতভর জেগে রইলো, নিজের প্রাণের বদলে আপনার জীবন ভিক্ষা চাইলো, বাবা পড়া লেখা করিয়ে মানুষ করলো, সামর্থানুযায়ী আপনার চাহিদা পুরন করলো, আপনার জীবনের উপযুক্ত বয়স পর্যন্ত দেখাশোনা খাওয়া দাওয়ার দিকে নজর রাখতো।মা বাবারা আপনার পিছনে এতো কিছু করেছিল । শুধু একটি স্ত্রীর নাগাল পাওয়ার পরেই আপনি সেই মা বাবাকেই এখন ভিন্ন ভাববেন ? তাঁদের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ করবেন না, তাদের মনে আঘাত দিবেন ? এটা পশুত্ব!মারাত্মক গুনাহের কাজ!
স্ত্রীর কথায় বা পরামর্শে-স্ত্রীর অধিকতর সুখের চিন্তা করে স্বামী যদি তার মা বাবার সেবা যত্ন না করে, দেখা শুনা না করে, বা কম করে, মা বাবার অবাধ্য হয়, মা বাবার সাথে দুরআচরন করে, মা বাবার মনে কষ্ট দেয়, তাহলে এই স্ত্রীকেও কাল কিয়ামতের ময়দানে জবাবদিহী করতে হবে।
আমাদের সমাজে অনেক পুত্রবধু নিজের সুখ নিশ্চিত করতে যেয়ে শাশুড়ীকে অভিশাপ ভেবে থাকে। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। পুত্রবধু শাশুড়ীর স্থান নিজ মায়ের আসনে আসীন করলে তার শাশুড়ীও তাকে মেয়ের জায়গায় স্থান দিতে বাধ্য থাকবেন। শিক্ষিত মূর্খ কিংবা কম বুদ্ধিমতি স্ত্রীরাই মায়ের তুল্য শাশুড়ী এবং পিতৃতুল্য শ্বশুরের সাথে যথাসাধ্য সম্মান প্রদর্শনপূর্বক মাধুর্যপূর্ণ আচরণ প্রকাশ করে না।
আবার মাতৃভক্তিতে স্ত্রীর প্রতি অবিচার করা,তার প্রাপ্য অধিকার নষ্টকরা,কিংবা স্ত্রীর ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে মা-বাবার দিলে আঘাত দেয়া কোনটাই কাম্য নয়। মায়ের পক্ষ নিয়ে স্ত্রীর প্রতি অবিচার করা মূলত মায়ের প্রতি যুলুম, তদ্রূপ স্ত্রীর পক্ষ নিয়ে মায়ের হক নষ্ট করা আসলে স্ত্রীর প্রতি যুলুম। ধমক দিয়ে, জোর খাটিয়ে সংশোধন করা যায় না, ঘরে অশান্তি আনা যায়, ঘর ভাঙ্গা যায়, আর সন্তানদের জীবনে বিপর্যয় আনা যায়। তাই পারস্পরিক আচরণ এমন হবে যেন দাম্পত্য জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একজন আরেকজনকে উত্তম স্বামী বা স্ত্রী মনে করে। আসলে দীর্ঘ সাধনা করেই হৃদয় জয় করতে হয়, মনের দুয়ার খোলতে হয়, অন্তরের গভীরে প্রবেশ করার মাধ্যমে সুখী পরিবার গঠনে বৌ ও পরিবারের অন্যান্য সদস্য-উভয়দিক থেকেই ভারসাম্যপূর্ণ আচরণই কাম্য।
আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ وَإِنْ تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ
অর্থঃ-হে মুমিনগণ, তোমাদের কোন কোন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের দুশমন। অতএব তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাক। যদি মার্জনা কর, উপেক্ষা কর, এবং ক্ষমা কর, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুনাময়। (সূরা তাগাবুনঃ-১৪)।

স্বামীর মা-বাবার খেদমত করা পরোক্ষভাবে স্ত্রীর নৈতিক দায়িত্ব। যদিও স্বামীর মাতা-পিতা স্ত্রীর জন্মদাতা মাতা পিতা নন, কিন্তু শ্বশুর-শাশুড়ি স্বামীর মাতা-পিতা। যেহেতু স্ত্রী মুহছেনা (সৎকর্মশীলা), সেহেতু খেয়াল রাখতে হবে যেনো কোনো জামেলা না হয়। ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা যায়!

উপসংহারঃ-

শাশুড়ি,পুত্রবধূ এবং পুত্র সকলকে নিজের অবস্থানে কৌশলী হতে হবে। শাশুড়িকে মা বানাতে হবে, আবার পুত্রবধূকে বনাতে হবে কন্যা।সৎকর্মপরায়না নারীরা বিনয়ী হয়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ

অর্থঃ-‘সৎকর্মপরায়না নারীরা বিনয়ী হয়।(সূরা নিসা-৩৪)।

একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে : এক নববধূর শাশুড়ি তাকে খুব জালাতন করতো, সে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জবাব দিলে আরো বেশি ক্ষেপে যেতো। পুত্রবধূ একটি কৌশল অবলম্বন করলো। সে শাশুড়ির গালমন্দের জবাব দেয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিলো, তাঁর আরো বেশি আদর যত্ন নিতে শুরু করলো। অপমানজনক কিছু বললে পুত্রবধূ এড়িয়ে যেতো। শাশুড়ি তাজ্জব হয়ে গেলো, হঠাৎ এ ব্যবহারে। এভাবে কিছু দিন যাওয়ার পরে, শাশুড়ির বোধ উদয় হলো। সে ভাবলো, যারে এতো অপমান করি, সে আমারে বেশি যত্ন নেয়। নাহ! আর পুত্রবধূর সাথে খারাপ ব্যবহার করবো না। এভাবে শাশুড়ি-নিজ বউয়ের সদ্ব্যবহারের কাছে পরাজিত হলো। এ কৌশলটি মেয়ে তার বাবার কাছ থেকে নিয়েছিলো।
যেই স্ত্রী স্বামীকে মানসিক দিক দিয়ে প্রফুল্ল রাখতে পারে। যে স্বামীর পরিবারের প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নিজের অঙ্গ সংস্থান ভেবে তার সুস্থতার জন্যে সার্বিক কাজ পরিচালনা করতে আন্তরিক থাকে, তাহলে পরিবারে তার অবস্থান দৃঢ় হবে নিশ্চয়ই।
নবীজী (সাঃ) ইরশাদ করেন,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ تُنْكَحُ النِّسَاءُ لأَرْبَعٍ لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَلِجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ ‏”‏

অর্থঃ-আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ নারীদেরকে (সাধারণত) চারটি বিষয় দেখে বিয়ে করা হয়। তার ধন-সম্পদ, বংশমর্যাদা, তার রূপসৌন্দর্য এবং তার দীনদারী। তবে তুমি দীনদার নারী বিয়ে করো। অন্যথায় তুমি লাঞ্ছিত হবে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২০৪৭)
একজন স্বামী তখনই নিজের স্ত্রীকে নিয়ে গর্ববোধ করতে পারে, যখনই ওই স্ত্রী তার পরিবারের মঙ্গল কামনায় সচেষ্ট থাকে। ধন-সম্পদ, শিক্ষা, বংশ, রূপ-সৌন্দর্যের অহঙ্কার না করে, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে বিনয়ী, উত্তম ব্যবহার, ভারসাম্যমূলক আচরণে গুরুত্বারোপ করে।
স্ত্রীকে স্বামী, স্বামীর বাড়ি, স্বামীর আত্মীয়স্বজনদের নিজের ভাবতে হবে। স্বামীর বাড়িকে নিজের বাড়ি মনে করতে হবে। তাহলে সেবা করা যাবে এবং নিজেকে তখন দাসী মনে হবে না। বৌ যদি আপন হতে পারে, তবে অবশ্যই শাশুড়ি আদর করবে। তবে শাশুড়ির দায়িত্বও অনেক বড়!! কিছু পেতে হলে উদার ও মহৎ হওয়া আবশ্যক!

(সংগ্রহ ও সংকলনেঃ-মোহাম্মদ আবদুল আজিজ মজুমদার
অধ্যক্ষ, হায়দরগঞ্জ তাহেরিয়া আর.এম.কামিল মাদ্রাসা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here