পাত্রী দেখা

12

প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য্য মানুষের মনকে নানা রঙ্গে রাঙ্গিয়ে দেয়। ফুলের সুবাসিত সৌরভ, সোৎস্নার হিমশীতল স্নিগ্ধতা, পাখির কলতান, সমুদ্রের গর্জনে, ঝরনার জলোচ্ছাস, ঈশান কোনের ঘূর্নায়িত বায়ু প্রবাহ প্রকৃতির স্বরুপ যেমনি পরিবর্তন করে দেয়, তেমনি নারীর মন প্রকৃতি মত বিচিত্রতায় ভরা। সৃষ্টিসুখের উল্লাস আর নিপিড়নের রক্তস্নাত অশ্রুধারা নারীর জীবনে প্রতিদিনের জীবনপ্রবাহ। যাদের জন্ম শিকল দিয়ে শৃঙ্খলিত তাদের সমগ্র জীবনই একটি আজন্ম কারাগার। নারীর প্রতিবাদের ভাষা তার অশ্রুজল। নারী ব্যাতিত সকলেই মানুষ। মানুষের মানবাধীকার থাকতে পারে কিন্তু নারীর মানবাধীকার থাকতে পারে না। মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার সার্বজনিন কিন্তু নারীর বেঁচে থাকার অধিকার পুরুষের দয়ার উপর নির্ভরশীল।

পুরুষ মানুষের পছন্দ দিয়েই একজন নারীর দাম্পত্য জীবনের শুভসূচনা হয়ে থাকে। নারীর পচন্দের গুরুত্ব গৌন। রুপের লাবন্যতা নারী সৌন্দর্য্য, লজ্জা নারীর ভূষন, ডাগর চোখ নারীর চুম্বকায়িত শক্তি, লম্বাচুল নারীর সম্পদ,হাত-পায়ের শৈল্পিক গঠন নারীর সাতরাজার ধন। নাকের গঠন,দাঁতের মুক্তাঝরা হাঁসির সৌন্দর্য্য নারীর সাধনার ধন। টল ফিগার নারীর প্রাথমিক আকর্ষন। নারীর জন্য তার পিতা-পিতামহ গোত্রীয় উত্তরাধীকার বংশের ঐতিহ্যের সুঘ্রাণ চারপাশ ঘিরে থাকতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষার প্রাথমিক বুনিয়াদ দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করতে হবে, সবকিছুই নারীর যোগ্যতার একেকটি মাপকাঠি। নম্রতা, ভদ্রতা,গৃহিনী,রাঁধুনি, সঙ্গিত, নিত্যকলা,নারীর বাড়তি যোগ্যতা তার জীবনের জন্য সম্পুরক শক্তি। পুরুষের একটাই যোগ্যতার প্রয়োজন অনেক টাকার মালিকানা অর্জন করা।

প্রকৃতির এক নিষ্ঠুর আচরন দিয়ে নারীর জীবনে দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়। হিমাদ্রী একজন নারী। বালিকা থেকে ধীরে ধীরে নারী জীবনে পদার্পন। ফুলের পাপড়ি প্রস্ফুটিত হওয়ার সূচনালগ্ন থেকেই পাত্র পক্ষের মৌখিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়।হিমাদ্রী দশম শ্রেনীতে উত্তির্ণ হয়ে পাত্রীদেখার মৌখিক পরীক্ষায় প্রথম অকৃতকার্য্য হন। বরের মা হাতের আঙ্গুল নাড়াচাড়া করে অমসৃণ হাতের ত্বক দেখে পাত্রীর সার্টিফিকেট পরে দিবেন বলে বিদায় হয়েছেন। হিমাদ্রীর মায়ের অনেক মন খারাপ হয়েছিলো।প্রথম পরীক্ষায় অকৃতকার্য্যার গ্লানির ভার অনেক বেশী ছিলো। বছরের মাথায় ঘটক বেটার অনেক চেষ্টায় বিদেশ ফেরত স্থূল স্বাস্থের বরের সন্মুখে মৌখিক পরীক্ষার জন্য হিমাদ্রীকে ড্রইংরুমে হাজির করা হলো। বিদেশী বরের সন্মুখে ঘোমটার পরিমান ছোট হওয়ায় এবং লাজলজ্জার পরিমান কম হওয়ায় হিমাদ্রী দ্বিতীয়বারের মত পরীক্ষায় অকৃতকার্য্য হন।

হিমাদ্রীর পুরুষ দ্বারা শাষিত সমাজের পাত্রী দেখার পরীক্ষায় একটির পর একটি অকৃতকার্য্য হলেও প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষায় যোগ্যতার সাথেই সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হন। পাত্রস্থকরার যোগ্যতাকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্যই হিমাদ্রী সদর জেলায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনার্সে ভর্তি হন। পাশের গ্রামের চৌধুরী বাড়ীর স্কুল শিক্ষক পাত্রের জন্য বিবাহের কথা পাকাপোক্ত হওয়ার পথেই ছিলো শুধু হিমাদ্রীর বাবার সম্মানজনক পেশা না থাকার কারনেই সেই বিবাহ ভেঙ্গে যায়।পাত্রের মায়ের সাফ কথা দোকানের কর্মচারীর মেয়ে তার পরিবারের পুত্রবধূ হতে পারে না। পাত্রপক্ষ খাওয়া-দাওয়া না করেই বিদায় হলেন। হিমাদ্রী নির্বাক হলেও তার ভেঙ্গে পড়ার কারন ছিলো না কেননা তার দৃঢ বিশ্বাস ছিলো যেই সকল অযোগ্যতায় একজন নারীর কোন হাত থাকে সেই সকল অযোগ্যতার জন্য কোন দুঃখবোধ থাকতে পারে না।

কন্যাদায়গ্রস্থ পিতা-মাতা সব সময়ই তার মেয়েকে পাত্রস্থ করার জন্য অস্থির থাকেন। হিমাদ্রীর বয়স বেশীর অজুহাতে পাত্রপক্ষের বিদায় নিয়েছেন। হিমাদ্রীর বেশী শিক্ষার অজুহাতে পাত্রপক্ষের পিছুটান। হিমাদ্রীর আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতের অজুহাতে ধর্মপ্রান পরিবারের পাত্রপক্ষের অনাগ্রহ। ধর্মকর্ম আর বেপর্দার অজুহাতে পাশের বাড়ীর মাদ্রার শিক্ষক পাত্রের জন্য হিমাদ্রী একেবারেই অযোগ্য। অনার্স পড়ুয়া হওয়ার কারনে কম শিক্ষিত ছেলেদের জন্য হিমাদ্রী পাত্রী হিসাবে অযোগ্য। হিমাদ্রীর বাবার ঘরদোর আসবাব পত্র মানান সই না হওয়ার অপরাধের সকল দায় যেন হিমাদ্রীর উপর বর্তায়। হিমাদ্রীর চলাফেরা স্বাভাবিক হওয়ার অভিযোগে আভিজাত্য পরিবার পাত্রী হিসাবে অবিবেচিত। হিমাদ্রীর পিতা-মাতার ধারনা মেয়েদের শিক্ষাদিক্ষা, রুপচর্চা, জ্ঞানগরিমা সাজসজ্জা সব কিছুই বিবাহের জন্য উপযুক্ত ভাবে তৈরী করা হয়। মেয়েদের বিবাহ পর্যন্তই প্রথম জীবনের সমাপ্তি।

হিমাদ্রীর বাড়ীতে আজ অনেক আয়োজন।উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান হয়েছে। পাত্রী দেখার পরই পছন্দ হলে আকত্ হবে। পাত্র একজন খাটি ধার্মিক, তাদের পূর্বপুরুষ ধর্মকর্মে অনুরক্ত। অর্থবিত্ত বৈভবে পাত্রদের অনেক সুনাম।হিমাদ্রীর অনার্স-মাষ্টার্সের কথা বিবেচনা করেই তাদের সাথে আত্তিয়তা করতে সন্মত হয়েছে। হিমাদ্রীকে গ্রাম্য সাজেই সাজানো হলো। পাত্রের বোন-ভগ্নিপতি, চাচাত-জ্যাঠাত ভাই বোন, মা খালা সহ অসংখ্য গুনগ্রাগীর আগমনে বাড়ী মুখরিত।বড় ঘর, পাকের ঘর, পুকুর ঘাট,পয়প্রণালী কোন কিছুই পচন্দ নয়। নুতন মেহমানদের বিদ্রুপাত্তক অঙ্গভঙ্গিতে সকলে মর্মাহত। ঘরের সন্মুখ কক্ষে অধীর আগ্রহে আনুষ্ঠানিক পাত্রী দেখা শুরু হলো।

দু’জন নারীর সহযোগিতায় হিমাদ্রীকে ঘরের সন্মুখের কক্ষে আনা হলো। হিমাদ্রীকে ঘরের ডানে বামে হাটানো হলো।পায়ের কদম মাপা হলো। দুই হাতে পায়ের আঙ্গুলের নোখ দেখা হলো। মাথার ঘোমটা সরায়ে চুলের দৈর্ঘ নির্নয় করা হলো। পাত্রের ছোটবোন ভিজা রুমাল দিয়ে হিমাদ্রীর মুখের কসমেটিক ঘষে তার প্রকৃত গায়ের রং পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করলেন। শারিরীক অবয়ব পরীক্ষার পর শুরু হলো মৌখিক পরীক্ষা।প্রথমেই পাত্রের পিত ধর্ম গ্রন্থের প্রথম পঙ্কতি জিজ্ঞাসা করলেন। হিমাদ্রী নির্বাক হয়ে পড়েন। পাত্র পক্ষ কোন সন্তোষজনক উত্তর না পেয়ে সকলে চোখাচোখিতে কথা বলাবলি হলো।পাত্রের মায়ের প্রশ্ন ছিলো হিমাদ্রী কি কি রান্নকরতে পারেন।পাত্রের বোনের প্রশ্ন ছিলো হিমাদ্রী যৌথ পরিবারের সংসারের কাজকর্ম করতে পারবে কিনা? সর্বশেষ পাত্রের শুধু একটি শর্ত অরোপিত হলো তাদের আভিজাত্য পরিবারে কোন বউ চাকরীবাকরি করতে পারে না। পাত্র পক্ষের প্রশ্নের মানদন্ড বিবেচনা করে হিমাদ্রী নিশ্চুপ হয়ে পড়েন। ইচ্ছা করেই কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি হলেন না।

পাত্রপক্ষ থেকে খাওয়া দাওয়া থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। পাত্রের পিতা হিমাদ্রীর হাতে পাঁছশত টাকার একটি নোট ধরিয়ে দিলেন। ঘটকের মাধ্যমে পরবর্তি করনীয় জানিয়ে দেওয়া হবে। পাত্র পক্ষের কোন প্রশ্নের উত্তর না দেওয়ায় হিমাদ্রীর পিতা-মাতা মর্মান্তিক ভাবে কষ্ট পেলেন। মেয়েকে পড়ালেখা করানো তাদের বোকামী ছিলো। এভাবে বিবাহ ভেঙ্গে যাওয়ার বেদনা সহ্য করার ক্ষমতা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের থাকে না। পাত্রের চাচাতো বোন বললেন মেয়ে খুবই ন্যাচারাল সুন্দরী তাকে বধূ হিসাবে পাওয়া পারিবারের ভাগ্য, এমন একটি কথাই হিমাদ্রীকে সকল গ্লানি থেকে মুক্ত হওয়ার পথ সুগম করে দিয়েছে। পাত্রী দেখার সামাজীক কুসংস্কারাচ্ছন্ন বজ্রাঘাতের চাইতে শিক্ষার শক্তি অনেক বড় তাহা হিমাদ্রীর জানা ছিলো।হিমাদ্রীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাকে অপকর্মের বিরুদ্ধে নির্ভিক হতে শিখায়েছে।

নারীর ক্ষমতায়ন রাষ্ট্রের নারী-পুরুষ সকল নাগরীকের অধিকার সমান। জেন্ডার বৈশম্যমুক্ত একটি দেশে নারীর জন্ম শুধু বিবাহের উদ্দ্যেশ্যে নয় এমন উন্নত ধারনা হিমাদীর পিতা-মাতার ছিলো না। হিমাদ্রীর পিতা ঘটকের বাড়ীতে অনেকবার ধর্ণা দিয়েও কোন উত্তর পান নাই। হিমাদ্রীর পরিবার আজ ক্লান্ত। ছোট ভাই বোনেরাও হিমাদ্রীর পাত্রী দেখার ব্যার্থ রোগে আক্রান্ত। হিমাদ্রী তার সিদ্ধান্তে অবিচল। রেজাল্ট প্রকাশ হলো।হিমাদ্রী ইংরেজি বিষয়ে মাষ্টার ডিগ্রি পাশ করে একটি কলেজে লেকসারার হিসাবে যোগদান করেন। হিমাদ্রী আজ পাত্রীদেখার বক্রপথ অতিক্রম করে পাত্রদেখার জায়গা দখল করতে সক্ষম হয়েছেন। অনেক শিক্ষিত পাত্রের জ্ঞানের দৌরত্ব দেখে হিমাদ্রী পাত্র হিসাবে বিবেচনা করতে নারাজ। কলেজের একজন প্রভাষক বিজ্ঞানমনস্ব আধুনিক রুচিশীল মার্জিত জীবনধর্মী মানুষ হিমাদ্রীর নারীত্বের শক্তিকে জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। তারা স্বামী স্ত্রী দু’জনই কলেজের শিক্ষক।

পাত্রীদেখার বিড়ম্বনা একজন নারীর জীবনে এক ভয়াবহ পরীক্ষা। পচন্দের আনন্দের চাইতে অপচন্দের মর্মাহত বেদনা শুধু পাত্রীকে নয় পুরো পরিবারকে আঘাত করে। বিলুপ্ত কুসংস্কারের সাথে গ্রামীন এই পদ্ধতি পরিত্যাগ করা সময়ের দাবী। বিবাহের স্বীদ্ধান্ত চূড়ান্তকরনের মাধ্যমেই পাত্রীদেখার আয়োজন করা উচিত যেন পিছনে ফিরতে না হয়।পাত্রীকে অপচন্দের অযুহাতে পাত্রীদেখার অনুষ্ঠান থেকে বিবাহ বাতিল করা সঠিক নয়। এই আচার-অনুষ্ঠান অন্যান্ন ক্ষতের মতই একটি সামাজীক ক্ষত।

এড. মিজানুর রহমান
জজ কোর্ট, লক্ষীপুর।
01712530834

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here