কুরবানীর গোশত বন্টনের শরয়ী নীতি : আবদুল আজিজ মজুমদার

39

দেশ জার্নাল ডেস্ক :
ভূমিকাঃ-কুরবানীর গোশত বন্টননীতি বলতে আমরা এখানে দু’ট বিষয় আলোচনার চেষ্টা করবো ইনশাল্লাহ । একটি হলো শরীকদের সাথে আংশিক কুরবানী দিলে তার গোশত বন্টন প্রক্রিয়া,অন্যটি হলো নিজের অংশের গোশত কারা খাওয়ার অধিকার রাখে।

(এক) শরীকদের সাথে আংশিক কুরবানী দিলে তার বন্টন প্রক্রিয়াঃ-

উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় ভাগে কুরবানী করা জায়েয।

তবে কয়েক শরীকমিলে কুরবানী করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ, কারো দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরীকের কুরবানীই সহীহ হবে না।

কুরবানী যত শরীকে হবে পশু তত ভাগই করতে হবে। কম-বেশী করা যাবেনা।কোন কোন এলাকায় সাত শরীকে কুরবানী করে আট ভাগ,ছয় শরীকে কুরবানী করে সাত ভাগ,
পাঁচ শরীকে কুরবানী করে ছয় ভাগ…………করা হয়।তা কোন ক্রমেই বৈধ হবেনা।

গোস্ত বন্টন করতে হবে ওজন করে।আন্দাজ করে নহে।যেমন…….. সাতজন মিলে অংশীদার হয়ে যদি একটি গরু কোরবানি করে, তবে গোশত নিজেদের ধারণা অনুযায়ী ভাগ করা যাবে না। দাঁড়িপাল্লা দিয়ে মেপে সমান সমান ভাগ করা লাগলে। অন্যথায় যদি ভাগের মধ্যে তারতম্য হয়ে যায়, তবে সুদ হয়ে যাবে এবং গোনাহগার হবে। অবশ্য যদি গোশতের সঙ্গে মাথা, পা বা চামড়া থাকে তবে অনুমান করে ভাগকরা যাবে।

বিখ্যাত ফিকহের কিতাব ফতহুল কাদীরের ভাষ্যানুযায়ীঃ-

وَتَجُوزُ عَنْ سِتَّةٍ أَوْ خَمْسَةٍ أَوْ ثَلَاثَةٍ ، ذَكَرَهُ مُحَمَّدٌ رَحِمَهُ اللَّهُ فِي الْأَصْلِ ، لِأَنَّهُ لَمَّا جَازَ عَنْ السَّبْعَةِ فَعَمَّنْ دُونَهُمْ أَوْلَى ، وَلَا تَجُوزُ عَنْ ثَمَانِيَةٍ أَخْذًا بِالْقِيَاسِ فِيمَا لَا نَصَّ فِيهِ وَكَذَا إذَا كَانَ نَصِيبُ أَحَدِهِمْ أَقَلَّ مِنْ السُّبُعِ ، وَلَا تَجُوزُ عَنْ الْكُلِّ لِانْعِدَامِ وَصْفِ الْقُرْبَةِ فِي الْبَعْضِ
…………………………..
وَإِذَا جَازَ عَلَى الشَّرِكَةِ فَقِسْمَةُ اللَّحْمِ بِالْوَزْنِ لِأَنَّهُ مَوْزُونٌ ، وَلَوْ اقْتَسَمُوا جُزَافًا لَا يَجُوزُ إلَّا إذَا كَانَ مَعَهُ شَيْءٌ مِنْ الْأَكَارِعِ وَالْجِلْدِ اعْتِبَارًا بِالْبَيْعِ

বিখ্যাত ফিকহের কিতাব “আল-বাদায়েউ সানায়েউ” ভাষ্যানুযায়ীঃ-

قال : وسألت أبا يوسف رحمه الله عن البقرة إذا ذبحها سبعة في الأضحية أيقتسمون لحمها جزافا أو وزنا ؟ قال : بل وزنا ، قال : قلت فإن اقتسموها مجازفة وحلل بعضهم بعضا ؟ قال : أكره ذلك ، قال : قلت فما تقول في رجل باع درهما بدرهم فرجح أحدهما فحلل صاحبه الرجحان ؟ قال : هذا جائز ؛ لأنه لا يقسم معناه أنه هبة المشاع فيما لا يحتمل القسمة وهو الدرهم الصحيح ، أما عدم جواز القسمة مجازفة فلأن فيها معنى التمليك ، واللحم من الأموال الربوية فلا يجوز تمليكه مجازفة كسائر الأموال الربوية وأما عدم جواز التحليل فلأن الربوي لا يحتمل الحل بالتحليل ولأنه في معنى الهبة ، وهبة المشاع فيما يحتمل القسمة لا تصح بخلاف ما إذا رجح الوزن

কসাই বা অন্য কাউকে পারিশ্রমিক হিসেবে কুরবানীর গোশত দেয়া জায়েয নয়। হাদিসে এসেছে-ولا يعطى جزارتها شيئا

অর্থঃ-‘তার প্রস্তুত করণে তার থেকে কিছু দেয়া হবে না’ (বুখারী-মুসলিম) তবে দান বা উপহার হিসেবে কসাইকে কিছু দিলে তা নাজায়েয হবে না।

(দুই) নিজের অংশের গোশত কারা খাওয়ার অধিকার রাখেঃ-

হজের হাদী,কুরবানী ও আকিকার পশুর গোশত সম্পর্কে ওলামাগণ নিন্মের আয়ত ও হাদীস গুলো দলীল হিাবে গ্রহণ করেন।
আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বলেন- فَكُلُواْ مِنۡهَا وَأَطۡعِمُواْ ٱلۡبَآئِسَ ٱلۡفَقِيرঅর্থঃ- ‘অত:পর তোমরা তা হতে আহার কর এবং দুঃস্থ, অভাব গ্রস্থকে আহার করাও।’ [সূরা হজ্জ্ব,:২৮]।

মহান আল্লাহ আরও বলেন- فَإِذَا وَجَبَتْ جُنُوبُهَا فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ

অর্থঃ-অতঃপর যখন তারা কাত হয়ে পড়ে যায় তখন তা থেকে তোমরা আহার কর এবং আহার করাও যে কিছু যাচ্ঞা করে না তাকে এবং যে যাচ্ঞা করে।

‘আহার করাও’ বাক্য দ্বারা অভাবগ্রস্থকে দান করা ও ধনীদের উপহার হিসেবে দেয়াকে বুঝায়। কতটুকু নিজেরা খাবে, কতটুকু দান করবে আর কতটুকু উপহার হিসেবে প্রদান করবে এব পরিমাণ সম্পর্কে কুরআনের আয়াত ও হাদিসে কিছু বলা হয়নি। তাই উলামায়ে কেরাম বলেছে, ‘কুরবানীর গোশত তিন ভাগ করে একভাগ নিজেরা খাওয়া, এক ভাগ দরিদ্রদের দান করা ও এক ভাগ উপহার হিসেবে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের দান করা মুস্তাহাব (উত্তম)।

রাসূলুল্লাহ (সা.) কুরবানীর গোস্ত সম্পর্কে বলেছেন- كلوا وأطعموا وادخروا‘তোমরা নিজেরা খাও ও অন্যকে আহার করাও এবং সংরক্ষণ কর।’ (বুখারী- মুসলিম)।

কুরবানীর গোশত যতদিন ইচ্ছা ততদিন সংরক্ষণ করে খাওয়া যাবে।‘কুরবানীর গোশত তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করা যাবে না’-বলে যে হাদিস বয়েছে তার হুকুম রহিত হয়ে গেছে।
তবে ইমামগণ এ বিষয়ে একটা সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, ‘সংরক্ষণ নিষেধ হওয়ার কারণ হলো দুর্ভিক্ষ। দুর্ভিক্ষের সময় তিন দিনের বেশি কুরবানীর গোশত সংরক্ষণ উচিত হবে না। তখন ‘সংরক্ষণ নিষেধ’ সম্পর্কিত হাদিস অনুযায়ী আমল করতে হবে। আর যদি দুর্ভিক্ষ না থাকে তবে যতদিন ইচ্ছা কুরবানী দাতা কুরবানীর গোশত সংরক্ষণ করে খেতে পারেন। তখন ‘সংরক্ষণ নিষেধ রহিত হওয়া’ সম্পর্কিত হাদিস অনুযায়ী আমল করা হবে।’ (ফাতহুল বারী)।

কেউ চাইলে সে তার কুরবানীর সম্পূর্ণ গোশতকে বিতরণ করে দিতে পাবে। আর তা করলে উপরোক্ত আয়াতের বিরোধিতা হবে না। কারণ, ঐ আয়াতে খাওয়ার আদেশ হলো মুস্তাহাব বা সুন্নাত। সে যুগের মুশরিকরা তাদের কুরবানীর গোশত খেত না বলে মহান আল্লাহ উক্ত আদেশ দিয়ে মুসলিমদেরকে তা খাবার অনুমতি দিয়েছেন। অবশ্য কেউ কেউ খাওয়া ওয়াজিবও বলেছেন। (তাফসীর ইবনু কাসীর) সুতরাং কিছু খাওয়া হলো উত্তম।

কুরবানীর গোশত হতে কাফেরকে তার অভাব, আত্মীয়তা, প্রতিবেশী অথবা তাকে ইসলামের প্রতি অনুরাগী করার জন্য।

লেখক :–
মাওলানা আবদুল আজিজ মজুমদার
অধ্যক্ষ,
হায়দরগঞ্জ তাহেরিয়া আর.এম.কামিল মাদরাসা।
রায়পুর-লক্ষ্মীপুর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here